৯৯ শতাংশ কারখানায় অর্ডার বাতিল ভাবনায় পোশাকশিল্প

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত গোটা বিশ্ব। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বিশ্বের ১৮৩টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়েছে এটি। বিপর্যস্ত ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো। আর এসব দেশেই সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। করোনার কারণে ইতোমধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের অর্ডার বাতিল করেছে। একদিকে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল, অন্যদিকে বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

এ অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে শ্রমঘন পোশাক কারখানাগুলো এখনো চালু রয়েছে। যেখানে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। কারখানাগুলোয় সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শ্রমিকদের কেউ যদি সংক্রমিত হন তা হলে করোনা ভাইরাস ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ অবস্থায় গার্মেন্টস চালু থাকবে না বন্ধ করে দেওয়া হবে সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠকে বসছে সরকার। তৈরি পোশাক শ্রমিকরাও আতঙ্কের মধ্যে আছেন। একদিকে সংক্রমণের ভয়, অন্যদিকে কাজ না থাকলে বেতন জুটবে কিনা সে উদ্বেগ তাদের কাবু করে ফেলেছে।

জানা গেছে, ইউরোপের ক্রেতারা বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ কারখানায় অর্ডার বাতিল করেছে। আগামী সোমবার আমেরিকার ক্রেতারাও অর্ডার বাতিল করবে বলে জানিয়েছে। ফলে যে যতটুকু কাজ করেছে ওই অবস্থায় পড়ে আছে।

এ পরিস্থিতিতে পোশাক খাতের করণীয় বিষয়ে আজ শনিবার শ্রম মন্ত্রণালয়ে এ খাতের ব্যবসায়ীরা জরুরি বৈঠকে বসবেন। ওই বৈঠকে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া আগামী মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, শ্রম প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক আমাদের সময়কে বলেন, ইচ্ছা করলেই আমরা কারখানা বন্ধ করতে পারি না। তবে সরকার সিদ্ধান্ত নিলে আমরা প্রস্তুত আছি। তিনি বলেন, ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করছে। কারখানাগুলোয় কাঁচামাল ফুরিয়ে আসছে। রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। জীবন বাঁচানোই দায়, পোশাক কিনবে কখন।

বিজিএমইএর সহসভাপতি এমএ রহিম বলেন, প্রায় ৯৯ শতাংশ কারখানায় অর্ডার বাতিল করেছে ক্রেতারা। নতুন করে কোনো কাজ হচ্ছে না। পুরনো কাজগুলো যে যতটুকু করেছে সে অবস্থায়ই পড়ে আছে। যার কাপড় কাটা হয়েছে তাকে সেলাই করতে নিষেধ করা হয়েছে, আর যার সেলাই হয়েছে তাকে বাড়তি আর কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ অবস্থায় এমনিতেই কারখানাগুলো ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে।

কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ নিয়েও চিন্তিত পোশাক ব্যবসায়ীরা। রপ্তানিকারক শিল্পমালিকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক কারখানায় কাজ নেই। অর্ডার বাতিল হচ্ছে। রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করার মতো অবস্থায় কেউ নেই। আমরা যাতে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে পারি সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আপৎকালীন সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ করব। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশই আপৎকালীন সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। বেঁচে থাকলে ব্যবসা করা যাবে। ব্যাংকগুলোকে সুদ ছাড়া ঋণের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের শুরুতেই শ্রমিকদের সুরক্ষা ও সচেতনতায় বিজিএমইএ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। গার্মেন্টগুলোয় সরকারি নির্দেশিকা প্রদর্শনের পাশাপাশি বিজিএমইএও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়। বিজিএমইএর কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়। চালু করা হয় হটলাইন। গার্মেন্টসশিল্প অধ্যুষিত এলাকায় বিজিএমইএর কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ৪টি এলাকাভিত্তিক কমিটি করা হয়েছে। এলাকাগুলো হলোÑ আশুলিয়া, সাভার ও নবীনগর; গাজীপুর, শ্রীপুর ও মাওনা; ডিএমপি এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জ।

কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে : জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন

করোনায় আক্রান্ত কোনো শ্রমিক চিহ্নিত হলে তাকে সবেতন চিকিৎসা প্রদান ও বিশ্রামে পাঠানোর দাবি জানিয়েছে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন। গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামরুল আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আমিরুল হক আমিন বলেছেন, ‘ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনে কারখানা বন্ধ রাখতে হলে শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে।’

বিবৃতিতে তারা বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের ঝুঁকির বাইরে নয় শ্রমিকরা। কিন্তু জনগণের জীবনের প্রয়োজনে শ্রমিকরা খাদ্য, ওষুধ, পরিসেবা, পরিবহন যোগাযোগ, তৈরি পোশাকসহ সব প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনে যুক্ত, এ জন্য তাদের অভিনন্দন জানাই। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য রক্ষায় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের রয়েছে ব্যাপক শ্রমঘন শিল্প। তা করোনামুক্ত রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশিত জীবাণু ও ভাইরাসমুক্ত রাখার সব সরঞ্জাম শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্য সরবরাহ করা এবং শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজ ও মজুরির অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার তাৎক্ষণিক উদ্যোগ গ্রহণেরও দাবি জানাচ্ছি। আক্রান্ত বিশেষ অঞ্চল বা এলাকায় শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষায় তাদের যাতে হাট-বাজারে যেতে না হয় তার জন্য বিনামূল্যে এক মাসের চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও জীবাণু নাশকারীসামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *