শরিয়াহ দৃষ্টিকোণে আইসোলেশন, লকডাউন ও হোমকোয়ারান্টাইন

মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমি ।।

পুরো পৃথিবী আজ স্তব্ধ স্তম্ভিত। শহরগুলোতে রিক্ততার বাতাস বয়ে চলছে। দিনদিন মহামারী (কোভিট-১৯) করোনা ভাইরাসে পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে ঝরছে কত প্রাণ। আক্রান্ত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। এ যেন বাতাসের বেগে সর্বত্র ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, ক্ষমতা আর সচেতন জনশক্তি নিয়েও পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যে ভাইরাসের এই পর্যন্ত কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেনি। আমাদের দেশের অবস্থাতো বলাই বাহুল্য।

কারণ, করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশের অবস্থা বড়ই নাজুক। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে শহর হতে অজপাড়াগাঁয়ে। প্রতিদিন কারো না কারো আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। মৃত্যুুর হারও বেড়ে চলেছে।

গতকাল বুধবার (২৬ মার্চ) এক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে আইইডিসিআর(IEDCR) পরিচালক জানান, সব মিলিয়ে দেশে এ পর্যন্ত ৭৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় ৩৯ জনের। এর মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। সাতজন সুস্থ হয়েছে। বাকি ২৭ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এখন পর্যন্ত ২১ হাজার মানুষ এবং ২০০ জনের প্রাণ হারানোর খবর এসেছে। অন্যদিকে এ ভাইরাস যাদের শরীরে শনাক্ত হয়েছে তাদের ১ লাখ ১৪ হাজার ২১৮ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এছাড়া ভাইরাসটি মোট শনাক্ত হয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৫ জনের শরীরে।

বর্তমানে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৮৭ জনের শরীরে এ ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে। চিকিৎসাধীন এসব মানুষের মধ্যে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৬৯৫ জনের অবস্থা স্থিতিশীল এবং ১৪ হাজার ৭৯২ জনের অবস্থা গুরুতর।

ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল চীনে- সেখানে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৮১ হাজার ২৮৫ জন এবং মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ২৮৭ জন। দেশটিতে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৬৭ জন এবং নতুন মৃতের সংখ্যা অন্তত ছয় জন।

ভাইরাসটিতে ইতালিতে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে মারা গেছেন ৭ হাজার ৫০৩ জন। এদের মধ্যে ৬৮৩ জন মারা গেছেন গেল ২৪ ঘণ্টায়। দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৩৮৬ জন।

সবমিলিয়ে অবস্থা খুব ভালো নয়।দেশের সকল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ধ। হাটবাজারে শূণ্যতা বিরাজ করছে।

সরকারী বেসরকারী স্বাস্থ্যবিভাগের পক্ষ থেকে বর্তমান ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের যথাসম্ভব প্রতিরোধকল্পে জনসমাগম এড়িয়ে জনবিচ্ছিন্ন কর্মকৌশল অবলম্বন করতে বলা হচ্ছে, সবাইকে নিজ নিজ বাসা-বাড়ি ও আবাসনে অবস্থান করতে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। কেউ আক্রান্ত হলে বা আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ হলে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।বিদেশফেরত এবং সন্দেহভাজন লোকদেরকে আইসোলেশনের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চল,এলাকা এবং জেলা-উপজেলা গ্রামকে লকডাউন করা হচ্ছে।

অনেকে আবার এগুলোকে তাকওয়া-তাওয়াক্কুল তথা খোদা ভীতি ও আল্লাহর উপর অকৃত্রিম আস্থা ও ভরসার প্রতিবন্ধক বলে সংশয়ের শিকার হচ্ছে। আসলে এটাই চূড়ান্ত বাস্তবতা যে,কিছুর থেকে কিছু হয়না, যা কিছু হয় আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা, ক্ষমতা ও হুকুমেই হয়।তবে আল্লাহ তা’আলা এই বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপনাকে স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন উপায়-উপকরন নির্ভর করেছেন-الدنيا دار الاسباب।

হ্যাঁ,কখনো কখনো এর ব্যতিক্রম হয়, ব্যত্যয়ও ঘটে। তবে সেটাও আল্লাহ তা’আলার হুকুমের কারনেই হয়।
সুতরাং আল্লাহ তাআলার উপর পূর্ন আস্থা ও ভরসা রেখে বাহ্যিক কার্যকারণ হিসেবে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রদত্ত পরামর্শগুলো পালন ও গ্রহণে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন সমস্যা নেই, বরং তা কার্যকর করা এখন শুধু সময়ের দাবিই নয়,সুন্নতে রাসূল ও উসওয়ায়ে সাহাবা দ্বারাও প্রমানিত। এ সংক্রান্ত কিছু উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরছি:

১। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং ও আইসোলেশন: সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব এর মানে হলো অকারণে বাইরে যাওয়া যাবেনা। গণপরিবহনে পারতপক্ষে উঠা যাবে না। আইসোলেশন এর অর্থ হলো বিচ্ছিন্ন থাকা যারা দেশের বাইরে থেকে এসেছেন বা সম্ভাব্য রোগীদের সংস্পর্শে এসেছেন বা নিশ্চিতভাবে করোনায় আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাঁরা নিজেদেরকে নিজ গৃহে আলাদা রাখা। নিজেদের স্বাস্থ্য নিজেরা পর্যবেক্ষণ করা।

জনবিচ্ছিন্ন কর্মকৌশল এবং সাহাবী যুগ: মহামারী চলাকালে এধরণের জনবিচ্ছিন্ন করনের একটি নির্দেশনা সাহাবী যুগেও পাওয়া যায়।
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগে ফিলিস্তিনে আমওয়াস মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মিসর বিজেতা হযরত আমর ইবনুল আ’স রা. সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বলেন- ان هذا الوجع اذا وقع فانما يشتعل اشتعال النار
যখন এ ধরনের মহামারী দেখা দেয় তখন তা আগুনের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। فخرج بهم عمرو بن العاص الی الجبال و قسمهم الی مجموعات منع اختلاطها ببعض

এরপর তিনি সবাইকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভাগ করে নির্দেশ দিলেন পরস্পর পৃথক হয়ে পাহাড়ে চলে যাও। তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেন যে,কেউ কারো সাথে মিশতে পারবেনা। পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে তারা দীর্ঘ দিন পাহাড়ে অবস্থান করেন। আক্রান্তদের অনেকে শাহাদাত বরন করেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তাআলা মহামারী তুলে নিলে সাহাবী ওমর ইবনুল আ’স রা. জীবিতদেরকে নিয়ে সুস্থ শরীরে শহরে ফিরে আসেন (তারিখে দিমাশক)।

২।লকডাউন: লকডাউন মানে বন্ধ ব্যবস্থা। এটা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নয়। এটা প্রশাসনিক বা সরকারি ব্যবস্থা। এর মানে হলো, বিমান বন্ধ, সীমানা বন্ধ, চলাচল বন্ধ। রাস্তাঘাট বন্ধ।

লকডাউন এবং নবীজির নির্দেশনা:এধরনের একটি নির্দেশনা হাদীসেও পাওয়া যায়। মহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ করতে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন এবং নিজ এলাকায় মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মৃত্যুর ভয়ে এলাকা ছেড়ে পলায়ন করতেও বারন করেছেন। মুসলিম শরীফের বর্ননায় তিনি বলেন-
الطاعون آية الرجز ابتلی الله عز و جل به ناسا من عباده فاذا سمعتم به فلا تدخلوا عليه واذا وقع بارض وانتم بها فلا تفروا منه
মহামারী হচ্ছে একটি আযাবের নিদর্শন। আল্লাহ তা’আলা এর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন।

লেখক, পরিচালক- মারকাযুদ দিরাসাতিল ইসলামিয়া-ঢাকা ও উস্তাযুল হাদিস, জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া-ঢাকা।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *