করোনাভাইরাসের পরীক্ষা অপর্যাপ্ত

পরীক্ষাগার বাড়ানো হচ্ছে তবে অনেক দেরিতে- ইকবাল আর্সনাল * এ পর্যন্ত কল এসেছে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৮৩টি, পরীক্ষা হয়েছে ৭৯৪টি

Microscopic view of Coronavirus, a pathogen that attacks the respiratory tract. Analysis and test, experimentation. Sars. 3d render

দেশে এ পর্যন্ত কতজন নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই কর্তৃপক্ষের কাছে- এমন অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, শুধু আক্রান্তের সংখ্যাই নয়, করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দেশে কতজন মানুষ বিদেশ থেকে ফিরেছেন, সেই হিসাবেও রয়েছে গরমিল। অপর্যাপ্ত পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং সুস্পষ্ট লক্ষণ থাকা ব্যক্তিদের পরীক্ষার আওতায় না আনার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সম্প্রতি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পরপর দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয় রাজধানীর টোলারবাগে। যাদের সঙ্গে কোনো বিদেশ ফেরত ব্যক্তির প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু এই দুই ব্যক্তির পক্ষ থেকে একাধিকবার রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে (আইইডিসিআর) অনুরোধ করা হলেও তারা পরীক্ষা করতে অনীহা প্রকাশ করে।
একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষা করলেও তার ফল পাওয়ার আগেই একজনের মৃত্যু হয়। শুধু এই দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রেই নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ করেন, আইইডিসিআরে আবেদন করা হলেও তাদের নমুনা সংগ্রহ বা পরীক্ষা করা হচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনা সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়া উল্লিখিত দুই ব্যক্তি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তারা দু’জনই স্থানীয় মসজিদে একসঙ্গে নামাজ পড়তেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। দ্বিতীয় যে ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে তার জামাতা, স্ত্রী এবং বাসার গৃহকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন।
টোলারবাগ ভবন মালিক সমিতির সভাপতি শুভাশিষ বলেন, আমাদের এলাকায় ৬৭২টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ভবনগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারাই ওই সব ভবনের খোঁজ নিচ্ছেন। এলাকার সবাই মোটামুটি ‘হোম কোয়ারেন্টিনে (বাড়িতে সঙ্গত্যাগ)’ রয়েছেন। কিন্তু এই এলাকার সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা এখনও করা হয়নি।
এদিকে হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করে যেসব প্রবাসীর তালিকা চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের অফিস থেকে দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে ‘অনেক বেশি’ লোক এরই মধ্যে বিদেশ থেকে নিজেদের এলাকায় এসেছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। হিসাবের বাইরে থাকা অন্যদের তথ্য সংগ্রহে থানা পুলিশের পাশাপাশি কাজ করছেন গোয়েন্দারা।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবমতে, চট্টগ্রামে ৯৭৩ জনকে ‘হোম কোয়ারেন্টিনে’ থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের হিসাবে, গত ১ মার্চ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ২০ হাজারের বেশি প্রবাসী দেশে ফিরেছেন।
যারা চট্টগ্রাম নগরীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১০ হাজার লোক চট্টগ্রাম মহানগরীতে অবস্থান করছেন। পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাসের ২০ দিনে অন্তত ২ লাখ ৯৩ হাজার প্রবাসী দেশে ফিরেছেন।
জানতে চাইলে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, এ পর্যন্ত ৭৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করেছি। অনেকে বলবেন, এ সংখ্যা এত কম কেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী যেসব মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার প্রয়োজন, তার মানে যাদের মনে করা হয়, তাদের মধ্যে এই সংক্রমণ থাকতে পারে, শুধু তাদের পরীক্ষা করা হয়।
অথচ গত ২১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সেবা পেতে অধিদফতর ও আইইডিসিআরের নির্ধারিত ফোন নম্বরে এ পর্যন্ত কল এসেছে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৮৩টি। এই তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বিত কন্ট্রোল রুমের। সেখান থেকে আরও জানা গেছে, গত ২১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আকাশ, সড়ক ও সমুদ্রপথে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৪২১ জন দেশে প্রবেশ করেছেন।
সব যোগাযোগ ব্যবস্থা এক প্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে প্রবেশ করেছেন ১ হাজার ১৩২ জন। যারা প্রত্যেকেই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এমন দেশ থেকে এসেছেন। তারা প্রত্যেকেই করোনাভাইরাস পরীক্ষার বাইরে রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, মিরপুরের উল্লিখিত মসজিদে যারা নামাজ পড়েন বা তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাদের সবারই পরীক্ষার আওতায় আনা উচিত।
কারণ, ওই দুই বৃদ্ধের মৃত্যু প্রমাণ করে দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন (সামাজিক সংক্রমণ) শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে ‘পরীক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষা’ এই নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটি হচ্ছে না। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা একরকম অজানা।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতোমধ্যে পরীক্ষাগার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অনেক দেরিতে। এই কাজটি আরও অনেক আগেই করা উচিত ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পরীক্ষার বাইরে রাখা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক প্রস্তুত না রাখা এবং হোম কোয়ারেন্টিনের মতো সিদ্ধান্তই দেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের আরও কয়েকটি স্থানে কোভিড-১৯-এর নমুনা পরীক্ষা করা হবে। ঢাকার জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট, শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই রোগের নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তবে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেস আজ থেকেই পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইইডিসিআরের ফিল্ড ল্যাবরেটরি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এ পরীক্ষা পদ্ধতি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *