কোন জাদুবলে করোনার থাবাকে রুখে দিল তাইওয়ান- সম্পাদকীয়। 

করোনার আগ্রাসী থমকে যেতে পারে একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার করুণা ও জনসচেতনতায়, একটু গভীর চিন্তা করে দেখুন- সম্পাদকীয়।

চীনের সবচেয়ে কাছের দেশের নাম কী যেন ? হ্যাঁ, মনে পড়েছে ― তাইওয়ান। দেশটা চীনের থেকে কত দূরে যেন ! মাত্র 81 মাইল। জনসংখ্যা – চব্বিশ মিলিয়নের কাছাকাছি। অথচ আজ পর্যন্ত কতজন করোনায় সংক্রমিত ? মাত্র 47 জন। মৃত্যু – মাত্র একজনের।

অথচ চীনে? প্রায় আশি হাজারেরও বেশি মানুষ করোনা সংক্রমিত এবং প্রায় তিন হাজারেরও বেশি মৃত !

তাহলে? কোন জাদুবলে করোনার থাবাকে রুখে দিল তাইওয়ান? কিন্তু পারল না ― ইতালি, আমেরিকার মতন অধিক উন্নত রাষ্ট্রগুলো ! কী এমন জাদু দেখাল তাইওয়ান যে WHO পর্যন্ত বাধ্য হল তাইওয়ানের দেখানো পথে ― অন্য রাষ্ট্রগুলোকে চলার পরামর্শ দিতে !

গল্পটা বুঝতে গেলে, ফিরে যেতে হবে ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৯ এর দিনটিতে। কারণ ওই দিনই চীন ‘হু’ কে প্রথম জানায় যে দেশে ―
‘সেভারাল আননোন কেসেস অফ নিউমোনিয়া’ ধরা পড়েছে।

আর সেই তথ্য জানতে পেরেই, তাইওয়ান সরকার সেই দিন থেকেই দেশের বিমানবন্দরগুলোতে ― চীনের উহান প্রদেশ থেকে আগত সমস্ত বিমান যাত্রীরা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত কিনা তার মনিটরিং শুরু করে দেয়।

পরবর্তী এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে, সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে ৩১শে ডিসেম্বর নয় বরং ২০শে ডিসেম্বর থেকে যাঁরা উহান প্রদেশ ভিজিট করেছেন, তাদের সকলের মনিটরিং করা হবে।

এই সিদ্ধান্ত হাতেনাতে ফলাফল দিতে শুরু করে । জানা যায় যারা ২০শে ডিসেম্বর নাগাদ চিনে ট্রাভেল করেছেন তাদের মধ্যে “২৬জন সার্স এবং মার্স ভাইরাসে আক্রান্ত”..। এই তথ্য জানতে পারা মাত্রই সংক্রামিত ব্যক্তিদের নিজেদের বাড়িতেই আইসলেশনে রাখার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং দেশের হাসপাতালগুলোতে যুদ্ধকালীন প্রক্রিয়ায় করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। তাইওয়ান বুঝতে পেরে গেছিল ― মহামারী আসছে। স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি নাগাদ তাইওয়ান আর একটা বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আমরা সকলেই জানি চীন আর তাইওয়ানের রাজনৈতিক সম্পর্ক কতটা তিক্ত। তাইওয়ানের সরকারি প্রতিনিধিদের খুব সহজে চীন নিজেদের দেশে ঢুকতে দেয় না।

সেকথা জানার পরেও, তাইওয়ান সরকার হঠাৎই চীনের করোনার বিরুদ্ধে লড়াইকে প্রশংসা জানাতে শুরু করে কিন্তু তাইওয়ানের আসল উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন।

সোজা কথায় চীনকে তেল মেরে, নিজেদের “সরকারি প্রশিক্ষিত প্রতিনিধি দলকে ― ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের জন্য” চীনে ঢোকানোর ব্যবস্থা করা। বলা বাহুল্য, চীন সেই প্রশংসায় প্রভাবিত হয়ে, সে দাবী মেনেও নেয়।

“চীন আমাদের যা দেখতে দিয়েছিল তা দেখে নয়, বরং যা আমরা দেখতে চাওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেখায় নি ― স্রেফ সেই সত্যের পর্যালোচনা করে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, চীন এক ভয়াবহ বিপদ বিশ্বের সামনে লুকোচ্ছে…”, তাইওয়ানের এক সরকারি মুখপাত্র এক সংবাদ সংস্থাকে জানান।

আর সেই পর্যালোচনার ওপর নির্ভর করে তাইওয়ান সরকার জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে দেশে এক ‘সেন্ট্রাল এপিডেমিক সেন্টার’ তৈরি করেন।

26শে জানুয়ারি, তাইওয়ান বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চীনের উহান প্রদেশ থেকে সব ধরনের বিমান পরিষেবা বন্ধ করে দেয় এবং প্রায় একই সময়ে দেশের বাইরে ফেস মাস্ক এর রপ্তানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেয় এবং দেশের মধ্যে প্রতিটি ফেস মাস্কের দাম ০.১৭ ডলারে বেঁধে দেয়।

২০০৩ এর সার্সের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে সে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে থার্মাল থার্মোমিটার আগে থেকেই বসানো ছিল, যাতে কেউ করোনার প্রথম উপসর্গ অর্থাৎ জ্বর নিয়ে সেই দেশে ঢুকতে না পারে।

প্রত্যেক বিমান যাত্রীকে QR কোডের মাধ্যমে নিজেদের ট্রাভেল হিস্ট্রি পাঠাতে বলা হয়। আর দ্রুত ইমিগ্রেশনের জন্য প্রত্যেক যাত্রীকে নির্দিষ্ট নম্বরে sms করে মুচেলেকা দিতে বাধ্য করা হয় যে তাঁরা আদৌ চীনের ভাইরাস সংক্রামিত অঞ্চল ট্রাভেল করেছেন, কি করেননি।

যারা হাই রিস্ক জোন এরিয়া ট্রাভেল করেছিলেন তাদের হোম আইসলেশনে রেখে নিজেদের মোবাইলে GPS সক্রিয় রাখতে বলা হয়, যাতে তাদের গতিবিধি চিহ্নিত করা যায়।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল যাঁদের টেস্ট রেজাল্ট প্রথমবারে নেগেটিভ এসেছিল, তাদের পুনরায় টেস্ট দিতে বলা হয়।

তাইওয়ানের ৯৯ শতাংশ মানুষের হেলথ ইন্সুরেন্স আছে। তাই তাদের বলা হয়, অসুস্থ বোধ করলে তৎক্ষনাৎ হাসপাতালে গিয়ে নিখরচায় টেস্ট করাতে, আর রেজাল্ট পজিটিভ হলে তাঁদের আইসলেশনে থাকাকালীন সরকার তাদের পরবর্তী চোদ্দ দিনের জন্য ফুড, লজিং এবং মেডিকেল খরচা দেবে।

এছাড়া টেলিভিশন এবং রেডিও স্টেশনগুলোকে প্রতি ঘন্টায় করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত আপডেট এবং করণীয় সতর্কতা অবলম্বনের উপায়গুলো প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই সিদ্ধান্তের ফলে এক সপ্তাহের মধ্যে দেশ বাসী জেনে যায় তাঁদের করোনা মোকাবিলায় ব্যক্তিগতভাবে কী সতর্কতা নিতে হবে আর কী এড়িয়ে যেতে হবে।

প্ৰতিটা প্রাইভেট এবং পাবলিক বিল্ডিং এর গেটে থার্মাল থার্মোমিটার লাগানো হয় যাতে জ্বর আক্রান্ত ব্যক্তিদের জনসমাগমে প্রবেশের আগেই আটকে দেওয়া যায়।

এক সরকারি আধিকারিকের কথায় ‘ওপেন ইনফরমেশন হল আসলে আশীর্বাদ। মানুষ কে আপনি যত বেশি তথ্য দেবেন বা তাদের কাছ থেকে পাবেন ― তত দ্রুত আপনি বিপদ অনুমান করতে পারবেন, আর তার প্রতিরোধে, উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবেন..”
উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো তাইওয়ানকে এক বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। WHO পর্যন্ত চমকে গেছে তাইওয়ানের এই উদ্যোগে। ফলত বিশ্বের সমস্ত দেশগুলোকে প্রায় একই ধরণের নির্দেশিকা দিয়েছে ― কোভিড19 এর বিরুদ্ধে লড়ার জন্য।

তাই আসুন। ভয় পেয়ে তথ্য লুকিয়ে লাভ নেই। নির্ভয়ে আপনার তথ্য সরকারের সাথে শেয়ার করুন। আর সরকারের উপদেশ যথা সম্ভব মেনে চলুন।

তাইওয়ান পারলে, আমরা কেন পারব না ! করোনা নয়, আজকের এই অসম যুদ্ধে জিতব আমরাই। শুধু সরকার আর নিজেদের ওপর ভরসা রাখতে হবে।

তাই সম্ভব হলে শেয়ার করুন এই বার্তাটি, সকলের সাথে। সতর্ক থাকুন। আতঙ্কে নয়।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *