পুলিশ-গোয়েন্দার যৌথ অভিযানে খালি হল নিযামুদ্দিন মার্কায।

প্রাণঘাতী মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপে কাঁপছে বিশ্ব। হানা দিয়েছে বিশ্বের ২শটি দেশে। আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ভারতে এই দূরত্ব নিশ্চিত করতে চলছে টানা ২১ দিনের লকডাউন। কিন্তু এর মধ্যেও চালু ছিল দিল্লির নিযামুদ্দিনে তাবলিগ জামাতের মার্কাযের কার্যক্রম।

ভারতীয় টেলিভিশন এনডিটিভির অনলাইন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে দিল্লির ওই মসজিদে অন্তত ২ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল। দিল্লিতে ওই মসজিদে শুধু ভারত নয় সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কিরগিজিস্তান থেকেও অনেকে অংশ নিয়েছিলেন।

দিল্লির ওই তাবলিগ জামাতে অংশ নেওয়া ৩ শতাধিক মানুষকে দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তারা এখন হাসাপতালে আইসোলেশনে রয়েছেন। ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপূঞ্জে ৯ ব্যক্তি তাদের মধ্যে একজনের স্ত্রীর দেহে করোনাভাইরাসে উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

এসমস্ত কিছুর প্রেক্ষিতে বড়সড় অভিযান চালানো হল দিল্লির মার্কাজ নিজামুদ্দিনে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের নেতৃত্বে দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিল করে দিল বড় এলাকা। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) মধ্যরাত থেকে বুধবার (০১ এপ্রিল) সকালের মধ্যে পুরোপুরি খালি করে দিল মার্কাজ চত্বর। সেখানে যত জন ছিলেন, সকলকে বার করে নিয়ে গিয়ে আইসোলেশনে পাঠিয়ে দিল পুলিশ। মার্কাজ চত্বরে বেশ কিছু কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলেও দিল্লি পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) মধ্যরাতেই নিজামুদ্দিনে গিয়েছিলেন অজিত ডোভাল। বড়সড় বাহিনী এবং গোয়েন্দা কর্তাদের নিয়ে ডোভাল কেন মাঝরাতে মার্কাজে হাজির হলেন, তা নিয়ে জোর জল্পনা ছড়াতে শুরু করেছিল। নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশন থেকে ডিফেন্স কলোনি পর্যন্ত একটা বড় এলাকাকে প্রথমে সিল করে দেওয়া হয় ডোভালের নির্দেশে। এর ফলে লাটিয়েন’স দিল্লি থেকে বিচ্ছিন হয়ে পড়ে দক্ষিণ দিল্লির লাজপত নগর বা চিত্তরঞ্জন পার্কের মতো এলাকা। স্থানীয়দের অনেকেই প্রথমে ভেবেছিলেন, গোটা এলাকায় জীবাণুনাশক ছড়ানো হবে। ডোভাল যে পুরো মার্কাজ চত্বর খালি করে দেওয়ার অভিযানে নেমেছেন, তা কেউ আঁচ করতে পারেননি।

বুধবার (০১ এপ্রিল) সকাল থেকে অভিযানের রূপরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করে। এলাকা সিল হয়ে থাকায় সে ভাবে কেউ রাস্তায় বেরনোর সুযোগ পাননি। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে চোখ রেখে দিল্লিবাসী বুঝতে পারেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নেতৃত্বে কী ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে।

নিজামুদ্দিন মার্কাজের যাঁরা শীর্ষ মৌলানা, মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাতে তাঁদের সঙ্গেই সর্বাগ্রে যোগাযোগ করেন অজিত ডোভাল। মার্কাজে জমায়েতের জেরে যে ঘটনা ঘটে গিয়েছে এবং যত জন ইতোমধ্যেই সেখান থেকে সংক্রামিত হয়েছেন, তার প্রেক্ষিতে আর কোনও ঝুঁকি নেওয়া যাবে না বলে মৌলানাদের জানান ডোভাল। যাঁরা তখনও মার্কাজে রয়েছেন, তাঁদের অবিলম্বে বার করে নিয়ে গিয়ে আইসোলেশনে পাঠাতে হবে, প্রত্যেককে পরীক্ষা করাতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা শুরু করাতে হবে— জানান ডোভাল। মার্কাজ খালি করে দেওয়ার পরে স্বাস্থ্য দফতর গোটা চত্বরকে জীবাণুমুক্ত করবে বলেও মৌলানাদের জানান ডোভাল।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কথা মৌলানারা মেনে নেন বলেই খবর। প্রশাসনিক অভিযানে তাঁরা সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেন। তার পরেই দিল্লি পুলিশ নিজামুদ্দিন মার্কাজ খালি করতে শুরু করে দেয়।

অজিত ডোভাল আসরে নামার আগেও কিন্তু পুলিশ-প্রশাসন এই কাজটাই করতে চেয়েছিল। কিন্তু তবলিগি জামাতের নেতৃত্ব সহযোগিতা করতে রাজি হননি। সংগঠনের প্রধান মৌলানা সাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি মার্কাজ খালি করতে দেবেন না। তার পরেই ডোভালকে ময়দানে নামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রাত ২টা নাগাদ নিজামুদ্দিনে যান ডোভাল। মৌলানা সাদের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিজে কথা বলেন এবং মার্কাজ খালি করার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হন। তার পরেই দিল্লি পুলিশ মার্কাজ খালি করার কাজ শুরু করে দেয়।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাত পর্যন্তও যাঁরা মার্কাজে থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের বার করে নিয়ে গিয়ে আইসোলেশনে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ। তাঁদের শারীরিক পরীক্ষা শুরু হয়। যাঁরা ইতিমধ্যেই অসুস্থ, তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসাও শুরু হয়ে গিয়েছে। করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট যদি পজিটিভ আসে, তা হলে তৎক্ষণাৎ তার চিকিৎসা শুরু করার প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে।

নিজামুদ্দিন চত্বরে পুলিশ বেশ কিছু কাঠামো এ দিন ভেঙে দিয়েছে বলেও খবর পাওয়া গিয়েছে। তবলিগি জামাতের যে ধর্মীয় সমাবেশের জন্য মার্কজে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোকের জমায়েত হয়েছিল, সেই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় ১২ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। যাঁরা সমাবেশে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের নানা প্রয়োজন মেটানোর জন্য কিছু অস্থায়ী কাঠামো গড়তে হয়েছিল নিজামুদ্দিন চত্বরে। অনেকগুলো দিন ধরে একসঙ্গে কয়েক হাজার লোকজন জমায়েত করে থাকায় বেশ কিছু আবর্জনাও জমেছিল সেখানে। সেই সব আবর্জনা সরাতে এবং মার্কাজ চত্বরকে পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত করার কাজ মসৃণ করতেই পুলিশ ওই সব কাঠামো ভেঙে দিয়ছে বলে খবর।

পুলিশি অভিযান শেষ হতেই স্বাস্থ্য দফতরের কর্মীরা মার্কাজে ঢোকেন। পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় মসজিদসহ গোটা মার্কাজ চত্বর। পুরোটাতেই জীবাণুনাশক ছেটানো হয়। ছড়িয়ে দেওয়া হয় ব্লিচিং পাউডার। আপাতত মার্কাজ চত্বরে কাউকে থাকতে দেওয়া হবে না— জানিয়েছে প্রশাসন। সেখানকার মসজিদে আপাতত নামাজের জমায়েতও হবে না বলে প্রশাসন জানিয়েছে। শুক্রবারের নামাজও নয়।

কিন্তু ১২ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত নিজামুদ্দিনের মার্কাজে অত বড় জমায়েত কী ভাবে করল তবলিগি জামাত, তা নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন উঠছে। তবলিগ নেতৃত্বের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে তো বটেই, গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগও উঠেছে।

মার্চের প্রথম সপ্তাহেই জমায়েত না করার বিষয়ে সতর্ক করতে শুরু করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। দেশটির রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হোলি খেলবেন না বলে জানিয়েছিলেন। দেশবাসীকেও হোলিতে জমায়েত না করার বার্তাই দিয়েছিলেন। প্রায় সব বড় বড় মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। পরীক্ষা স্থগিত করা হচ্ছিল, স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। লকডাউন তখনও ঘোষিত হয়নি। কিন্তু জমায়েত যে এড়াতেই হবে, সে বার্তা গোটা দেশেই তখন ছড়িয়ে গিয়েছে। তার পরেও তবলিগি জামাত অত বড় জমায়েত কেন করল? কেন পিছিয়ে দেওয়া হল না কর্মসূচি? প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

আর জমায়েতের বিরুদ্ধে যখন গোটা দেশে সতর্কবার্তা জারি করা হচ্ছে, তখন রাজধানীর বুকে অত বড় জমায়েত অত দিন ধরে যে চলবে বা চলছে, তা কেন প্রশাসন জানতে পারল না, সে প্রশ্নও উঠছে। দেশের ১৮টা রাজ্য থেকে লোকজন হাজির হচ্ছিলেন নিজামুদ্দিনে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ থেকেও লোকজন দিল্লিতে ঢুকছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সদর দফতর নর্থ ব্লকের নাকের ডগায় তাঁরা সবাই জড়ো হচ্ছিলেন। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনও নজরই কি ছিল না সে দিকে? এই প্রশ্নও উঠছে। ফলে বড়সড় গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগও সামনে আসছে।

তবে বিলম্বে হলেও বোধোদয় হয়েছে প্রশাসনের। ডোভালের নেতৃত্বে হওয়া অভিযানে এ দিন মার্কাজ থেকে যাঁদের বার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ২১৬ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছে বলে খবর। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই মুহূর্তে আরও প্রায় ৮০০ জন মার্কাজফেরত বিদেশি নাগরিক ছড়িয়ে পড়েছেন বলে দেশটির গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে। তাঁদের অবিলম্বে খুঁজে বার করে আইসোলেশনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ওই বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ করা হবে বলে খবর।

বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে যাঁরা মরকজে গিয়েছিলেন, তাঁরা ভিসার আবেদনে নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন পর্যটক হিসেবে। ধর্মপ্রচারের কাজে এলে ভিসার আবেদনে ‘ধর্মপ্রচারক’ পরিচয়ই দিতে হবে, নিয়ম তেমনই। তথ্য গোপন করে ভারতে ঢোকার ভিসা নেওয়ার অপরাধে ওই বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। তাঁরা কালো তালিকাভুক্ত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী কালে আর কখনও ভারতে ঢোকার ভিসা পাবেন না।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *