প্রাণ ফিরে পেলো প্রকৃতি

করোনাভাইরাস সারা বিশ্বে মানবকুলের জন্য অভিশাপ হয়ে এলেও প্রাণ-প্রকৃতির জন্য এক প্রকার আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শান্ত নিঝুম প্রকৃতির আসল ছবি ফুটে উঠছে সর্বত্র। কক্সবাজার থেকে কুয়াকাটা, শালবন থেকে সুন্দরবন- চারদিক প্রকৃতি এখন অপরূপ। সৈকতের তীরে নিজেদের আবাস ফিরে পেয়ে আনন্দের সুর তুলছে লাল কাঁকড়া। প্রায় কিনারে এসে লাফিয়ে নাচছে রংবেরঙের ডলফিন। সজীব হয়ে উঠছে বন। শব্দ ও বায়ুদূষণের জন্য বিশ্বব্যাপী সমালোচিত ঢাকাসহ শহরগুলো এখন অনেকটা নীরব। এতে সজীবতা ফিরেছে প্রাণ-প্রকৃতিতে।

ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ কার্যত লকডাউন। অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতিকে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভয়াবহ সংকটকাল। কিন্তু এর উল্টো দিকও রয়েছে। যানবাহন চলাচল এবং পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড স্থগিতের ফল মিলছে হাতেনাতে। বিশ্বজুড়ে কমেছে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের হার। বায়ুসূচক নেমেছে স্বস্তির জায়গায়। দূষণের এই দুটি অনুঘটকের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে গোটা দুনিয়ার পরিবেশের চরিত্র। বিশেষ করে বিস্ময় জাগিয়ে বদলে গেছে বৈশ্বিক বায়ুসূচকে শীর্ষস্থান দখলে রাখা ঢাকার চিত্র।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভিড-১৯ সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, জলবায়ুর প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিচারের ফল কী হতে পারে। অপরিকল্পিত ও পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারে না, বরং ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়টি আরও একবার প্রমাণ হলো। তবে সবকিছু স্বাভাবিক হলে প্রকৃতি আবার সেই বিবর্ণ চেহারায় ফিরে যাবে। বরং এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যদি কিছুটা হলেও পরিবেশের দিকে নজর দেয়, সেটাই হবে বড় সাফল্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল সমকালকে বলেন, ক’দিন ধরে শহরের ওপর নীল আকাশ দেখা যায়। এতদিন আকাশের সৌন্দর্য ঢাকা ছিল ধূসর বর্ণে। করোনা পরিস্থিতিতে দূষণীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার সুফল এটি।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটির আওতায় দেশ। জরুরি সেবা বাদে ঢাকাসহ সারাদেশে বন্ধ রয়েছে যানবাহন চলাচল। বেশিরভাগ কলকারখানা বন্ধ। এতে শুধু বায়ু আর শব্দদূষণ কমেছে তা নয়, বরং সাতসকালে পাখির যে কলরব, সেটিও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ব্যতিক্রম। রাজধানীর বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক এবং সবুজবাগের বৌদ্ধ মন্দির এলাকার সবুজঘেরা পরিবেশে কিছুক্ষণ ঘুরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির খুনসুটিও দেখা গেছে।

পাখি বিশেষজ্ঞ বিপ্রদাশ বড়ূয়া সমকালকে বলেন, পরিবেশ এখন খুবই শান্ত-স্নিগ্ধ। দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতর বসে থাকলেও বাইরে থেকে পাখির গুনগুন শোনা যায়। আশপাশের ঝাঁঝালো শব্দ নেই। ফলে পাখিদের ডাক আরও মধুর লাগে। এমনিতেই বসন্তকালে অনেক পাখি বিচরণ করে। তার সঙ্গে কভিড-১৯ সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পরিবেশের এখন সুদিন। ফলে যেসব পাখির আনাগোনা ছিল না বা খুবই কম ছিল, সেগুলোও দেখা যাচ্ছে।

রাজধানীর বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। গবেষণা বলছে, গণপরিবহন বন্ধের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শব্দের মাত্রা অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে। ধানমন্ডি এলাকার শব্দ আগে কখনও ৮০ ডেসিবলের নিচে ছিল না। এখন ৪০ ডেসিবলের ওপরে ওঠে না। একই অবস্থা অন্যান্য এলাকায়ও।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও ক্যাপস প্রধান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার সমকালকে জানান, লকডাউন পরিস্থিতি থাকায় বায়ুদূষণ রোধে অভাবনীয় উন্নতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তিন দিন ধরে যানবাহন চলাচল কিছুটা বেড়ে যাওয়ার প্রভাবও লক্ষণীয়। বিশেষ করে মঙ্গল ও বুধবার ঢাকার বাতাসে দূষিত বস্তুকণা পিএম২.৫ এর মাত্রা ফের বেড়েছে। দূষণের বিষয়গুলো যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, বর্তমান পরিস্থিতি সেটিই প্রমাণ করে।

তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সবকিছু আগের মতো হয়ে যেতে পারে। তবে ভবিষ্যতে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। পরিবেশের পক্ষে কথা বলার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, পরিবেশ ইস্যুতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি মেরুকরণ হতে যাচ্ছে।’

সায়মন বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব রহমান রুহেল সমকালকে বলেন, ‘পর্যটকের আনাগোনা বন্ধের পর সমুদ্রসৈকতে অন্যরকম পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। এক সকালে হাঁটতে গিয়ে দেখি ডলফিনের লাফালাফির দৃশ্য। এ ঘটনা সত্যিই অভাবনীয়। যেন চোখে আটকে রয়েছে। এখানকার কেউ কেউ বলছেন, ২০১১ সালে একবার ডলফিন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সমুদ্রের এত সুন্দর রূপ এর আগে দেখিনি।’

তিনি জানান, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দেশের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। কক্সবাজারসহ সারাদেশে বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে। বন্যহাতি চলাচলের জায়গা পর্যন্ত বিরানভূমি হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা না থাকার কারণে দূষণ বেড়েছে। পর্যটকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। স্থানীয় হোটেলগুলোর বর্জ্যও যাচ্ছে সমুদ্রে। একবার ব্যবহূত (ওয়ানটাইম) প্লাস্টিকের বহুল ব্যবহার এখানে। কভিড-১৯ ঘিরে পরিবেশগত যে পরিবর্তন, সেটি আসলে পরিবেশেরই শিক্ষা বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্বকে টালমাটাল করে দেওয়া কভিড-১৯ ‘পরিবেশের শিক্ষা’ বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পার্টিসেপটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামসুদ্দোহা। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষাগ্রহণের অনেক কিছু আছে জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের কর্মকাণ্ডই যে পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তা বোঝার জন্য এটিই উপযুক্ত পরিস্থিতি।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *