করোনায় অন্ধকার বাঙালির উৎসবের পহেলা বৈশাখ

সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার একটি কবিতায় লিখেছেন— ফুল ফুটুক আর নাই ফুটক আজ বসন্ত। ঠিক তেমনই রবি ঠাকুরের লেখা ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলা নববর্ষ বরণ করে নেয়াও বাঙালি জাতির একটি চিরন্তন রীতি।

পুব দিগন্তে সূর্য উঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাংলা নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু বৈশ্বিক কোভিড-১৯ এর মহামারি কারণে এবার নেই সূর্য উঠার মুহূর্তে কোনও আনুষ্ঠানিকতা।

কোডিভ-১৯ এর প্রাদুর্ভাব রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে দেশে কোথাও আয়োজন নেই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। রমনার অশত্থমূলে (বটমূল নয়) ছায়ানটের বর্ষবরণের প্রভাতী অনুষ্ঠান ও চারুকলার মঙ্গলশোভাযাত্রা বর্ষবরণে প্রধান আয়োজন। কিন্তু এবার তাও হচ্ছে না। বাতিল করা হয়েছে ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন ও চারুকলা অনুষদের মঙ্গলশোভাযাত্রা।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাঙালি কোভিড-১৯ এর মহামারি থেকে সহসা মুক্তির প্রত্যাশা নিয়েই মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ভোরে সূর্য উঠার মধ্য দিয়ে সূচনা হলো নতুন বছরের। শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৭।

পহেলা বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে মেতে ওঠার কথা ছিল এবারও। সকালে ভোরের প্রথম আলো রাঙিয়ে দেয় নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাকে। রাজধানীজুড়ে থাকার কথা মঙ্গলশোভাযাত্রা নিয়ে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে এখন চলছে করোনাকাল। মানুষের পৃথিবীতে এখন চলছে অনিশ্চিত সময়।

এর আগে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পহেলা বৈশাখের সমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। সারাদেশে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি চলছে। এটা ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। এবার তাই কোনও রকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই নতুন বাংলা বর্ষকে বরণ করে নেয়া হবে।

ঐতিহ্যবাহী রমনার অশত্থমূলে (বটমূল নয়) হচ্ছে না ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান। তবে সরকারি এবং বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতারে নববর্ষের বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। সকাল ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ছায়ানটের বিশেষ অনুষ্ঠান।

বাংলা নববর্ষের দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির বা উপাসনালয়ে না গিয়ে নিজ-নিজ গৃহে অবস্থান করে আনুষ্ঠানিকতা পালনের আহবান জানান হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারি পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি এ অনুরোধ জানানো হয়।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে দেশবাসীসহ বাঙালিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, যে আঁধার আমাদের চারপাশকে ঘিরে ধরেছে, তা একদিন কেটে যাবেই। বৈশাখের রুদ্র রূপ আমাদের সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করে। মাতিয়ে তোলে ধ্বংসের মধ্য থেকে নতুন সৃষ্টির নেশায়।

প্রধানমন্ত্রী নজরুলের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার কয়েকটি পঙক্তি উচ্চারণ করেন— ‘ঐ নতুনের কেতন ওরে কাল-বোশেখীর ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? / প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন/ আসছে নবীন- জীবন-হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন’।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের যে গভীর আঁধার আমাদের বিশ্বকে গ্রাস করেছে, সে আঁধার ভেদ করে বেরিয়ে আসতে হবে নতুন দিনের সূর্যালোকে। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় তাই বলতে চাই— ‘মেঘ দেখ কেউ করিসনে ভয়/আড়ালে তার সূর্য হাসে,/হারা শশীর হারা হাসি/ অন্ধকারেই ফিরে আসে।’

কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন।

১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে।

কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে।

পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনার অশত্থমূলে ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজনের মাধ্যমে।

দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে।

 

এক বিবৃতিতে ছায়ানটের সভাপতি সন্‌জীদা খাতুন বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমান মহামারিতে বিশ্বজুড়ে অগণ্য মানুষের জীবনাবসান ও জীবনশঙ্কার ক্রান্তিলগ্নে ছায়ানট এবারের এ উৎসবের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- ‘উৎসব নয়, সময় এখন দুর্যোগ প্রতিরোধের’।

সন্‌জীদা খাতুন বলেন, ‘পাকিস্তানি আমলের বৈরী পরিবেশে বাঙালির আপন সত্তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর মানবকল্যাণের ব্রত নিয়ে ১৯৬১ সালে ছায়ানটের জন্ম। এই সংগঠন আজন্মই সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ। লক্ষ্য অর্জনে

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *