প্লাজমা থেরাপিতে সারবে করোনা আশ্বাসে চিকিৎসকরা

করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় অবশেষে প্লাজমা থেরাপির বিষয়ে স্বাস্থ্য সেক্টরের নীতিনির্ধারক মহলে বরফ গলতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকজন তরুণ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নানামুখী আবেদন-নিবেদনের পর বিষয়টিকে আমলে নেয়া হচ্ছে। ভারতের ন্যায় এখানেও প্লাজমা থেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। এ জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে ডিএমসিএইচের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএ খানকে সভাপতি করে রোববার ৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

 

কমিটির সদস্যরা হলেন : বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী, ডিএমসিএইচের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির এবং ডিএমসিএইচের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মাজহারুল হক তপন। কমিটিকে ৫ দিনের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে সিরাম প্রয়োগের জন্য প্রটোকল প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনে কমিটি একাধিক সদস্যকে কো-অপ্ট করতে পারবে।

 

এর আগে প্লাজমা থেরাপি নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে দেশের তরুণ চিকিৎসকদের একটি গ্রুপ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা অব্যাহত রাখে। ই-মেইল এবং মোবাইল ফোনে এসএমএস দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন তারা। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ শুরু হলেও বাংলাদেশ এখনও প্রস্তুত নয়। তবে সম্পূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত এই চিকিৎসা পদ্ধতি ইতোমধ্যে শুরু করেছে ভারত, চীন ও জাপান। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্লাজমা থেরাপি হচ্ছে একটি প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি। যেখানে করোনা থেকে সেরে ওঠা মানুষের রক্ত থেকে প্লাজমা নিয়ে আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রয়োগ করা হবে। এরপর তার শরীরে এন্টিবডি কাজ করলে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসকরা চাইলেও এখনই করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি শুরু করতে পারছেন না। কারণ, এ ক্ষেত্রে করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের রক্ত প্রয়োজন। সরকারের হাতে রয়েছে সুস্থদের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা। তাই প্রথমেই তালিকা ধরে তাদের রক্তদানে উৎসাহিত করার কাজটি সরকারকেই করতে হবে। আর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে সফলতা পাওয়া গেলে কারোনা আতঙ্ক অনেকটাই কেটে যাবে।

 

প্লাজমা থেরাপির সফলতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক আশরাফুল হক রোববার যুগান্তরকে বলেন, করোনাবিরোধী এন্টিবডির কারণে প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে আক্রান্ত রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেকটাই উজ্জ্বল। তবে একেবারে সংকটাপন্ন রোগীকে প্লাজমা দিয়ে ম্যাজিক্যালি সুস্থ করে তোলা যাবে-বিষয়টি এমন নয়।

 

বর্তমানে ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় সরাসরি নিয়োজিত কয়েকজন চিকিৎসক প্লাজমা থেরাপি নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেন। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসায় সরাসরি নিয়োজিত আছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ খালেদ মো. ইকবাল।

 

শনিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, করোনা চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত শতভাগ নিশ্চিত কোনো চিকিৎসা নেই। ভারতে করোনা রোগীদের ওপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করে সুফল মিলেছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি ভারতের চিকিৎসকদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে সংকটাপন্ন কয়েকশ’ রোগীকে সুস্থ করে তোলার কথা বলছে চীন। যারা সংকটাপন্ন তাদের ওপর প্লাজমা থেরাপি দিলে তাদেরও জীবন বাঁচানো সম্ভব।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনা আক্রান্ত হওয়া মানেই কিন্তু মৃত্যু নয়। আমাদের হাসপাতালে যেসব পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের একজনও গুরুতর অসুস্থ হননি; বরং অনেকেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। আমরা জরিপ চালিয়ে দেখেছি, আক্রান্তের শুরু থেকেই আইসোলেশনে ছিলেন এমন রোগীদের মৃত্যুহার নেই বললেই চলে। কারণ, করোনা পজিটিভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী আমরা হাইড্রোক্লোরোকুইন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করছি।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ৮০ শতাংশ করোনা রোগী কোনো জটিলতা ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠছেন। বাকিদের মধ্যে কারও কারও শ্বাসকস্ট দেখা দেয়। তাদের অক্সিজেন দেয়ার প্রয়োজন হয়। মাত্র দশমিক ২ থেকে ৫ শতাংশ রোগীর ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন। তবে করোনা রোগী ভেন্টিলেশনে একবার চলে গেলে মৃত্যুঝুঁকি থাকে অনেক বেশি।

 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুস্থ হয়ে ওঠার উজ্জ্বল সম্ভাবনার কারণে কারোনায় আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে যেসব চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তারাও নিজেদের শরীরে প্লাজমা থেরাপি শুরু করতে চাচ্ছেন। এ বিষয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেন, ধানমণ্ডিতে নিজের বাসায় আইসোলেশনে থাকা করোনা আক্রান্ত এক চিকিৎসক। তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে তিনি করোনা সংক্রমিত হন।

 

ওই চিকিৎসক যুগান্তরকে বলেন, তার মধ্যে করোনার মৃদু সংক্রমণ রয়েছে। তিনি মনোবল হারাননি। শুকনো কাশি ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা নেই। তারপরও তিনি এখনই প্লাজমা থেরাপি নিতে চান। চিকিৎসক বলেন, আমি পারলে আজই এন্টিবডি প্লাজমা নিতে চাই। কারণ, এতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। যদি এন্টিবডি কাজ করে, তবে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠব।

 

চিকিৎসকরা বলছেন, সম্প্রতি করোনায় বাংলাদেশে মৃত্যুহার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে উপসর্গ লুকিয়ে রাখার প্রবণতা। যারা মারা যাচ্ছেন তাদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগই রোগ লুকিয়ে রেখে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে এসেছেন। আবার চিকিৎসা ছাড়াই অনেকের মৃত্যুর পর করোনা শনাক্ত হচ্ছে। তথ্য লুকানোর কারণে দুটি সমস্যা হচ্ছে।

প্রথমত, রোগ লুকিয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক রোগী চিকিৎসককে সংক্রমিত করছেন। দ্বিতীয়ত, সংক্রমিত চিকিৎসক অন্য সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলার বদলে করোনায় সংক্রমিত করছেন। এর সঙ্গে নার্স, মেডিকেল স্টাফসহ অনেকেই সংক্রমিত হচ্ছেন। তাই উপসর্গ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে। আইসোলেশনে থেকে নিতে হবে চিকিৎসা। তাহলে করোনায় মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ২ শতাংশের বেশি হবে না।

 

এ ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকায় এখানে মৃত্যুর উচ্চহার সহজেই ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু যদি রোগ লুকানোর চেষ্টা করা হয়, তবে রোগী নিজে মরলেন, পরিবারের সদস্যদেরও ঝুঁকিতে ফেললেন। আবার হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসককেও সংক্রমিত করে দিলেন। এটা হল আত্মহত্যার শামিল। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, গ্রিন লাইফ, ইউনাইটেড, বারাকাহ কিডনি হাসপাতালসহ যেখানেই চিকিৎসক-নার্সরা সংক্রমিত হয়েছেন, তা হয়েছে রোগী তথ্য গোপন করার কারণে। সংক্রমিত চিকিৎসক থেকে হাসপাতালের অন্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই করোনায় তথ্য গোপন করা আত্মঘাতী।

 

প্লাজমা থেরাপির জন্য রক্তদাতা পাওয়া নিয়ে সংকট হবে কি না, তা জানতে চাইলে একজন চিকিৎসক বলেন, প্রথমে সরকারি সহায়তায় সচেতন শ্রেণির মাধ্যমে এটা শুরু করতে হবে। যেমন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠা চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী ও ছাত্রদের কাছ থেকে প্লাজমা নিতে হবে। ধীরে ধীরে বাকিরাও মানুষের জীবন বাঁচাতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। করোনা থেকে যারা সুস্থ হয়ে উঠবেন, তারা একেকজন আক্রান্ত রোগীদের জন্য সম্ভাবনার আধারে পরিণত হবেন।

 

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তির কাছ থেকে ৮শ’ মিলিলিটার রক্ত নেয়া হয়। এরপর সেখান থেকে প্লাজমা পৃথক করে আক্রান্তের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে কেউ সুস্থ হয়ে উঠলে তার শরীরে করোনাবিরোধী এন্টিবডি তৈরি হয়। তার কাছ থেকে প্লাজমার মাধ্যমে সেই এন্টিবডি নিয়ে আক্রান্তের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এতে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। রোগীর সম্মতি নিয়েই এই চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়।

 

সূত্র বলছে, গত বছর ডেঙ্গু চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করে আশাতীত ফল পান ঢাকার বেশ কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা। দ্রুত প্লাটিলেট কমে যাচ্ছিল এমন রোগীদের প্লাজমা দেয়ার ফলে তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *