রোনাভাইরাস শঙ্কা নিয়েই ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় খোলা অর্ধশত গার্মেন্টস

২৬শে এপ্রিল,রবিবার, ২০২০

একদিকে করোনাভাইরাস, অন্যদিকে চাকরি হারানোর ভয়। সেই সাথে পাওনা বেতনের দাবি নিয়ে শ্রমিদের ক্ষোভের মধ্য দিয়েই নারায়ণগঞ্জে খোলা হয়েছে বেশ কিছু গার্মেন্টস।

শ্রমিকরা বলছেন, এক হাজার শ্রমিকের মাঝে একজন করোনা রোগী থাকলেও অবস্থা হতে পারে ভয়াবহ। এদিকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও সরকারি নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বাহিরে অবস্থানকৃত শ্রমিকদের কারখানায় আসার জন্য নিরুৎসাহিত করা হলেও এই বিষয়টি নিয়ে এখনও অন্ধকারে কয়েক লাখ শ্রমিক।

অপরদিকে কাজে যোগদানের চেয়ে শ্রমিকদের চোখে মুখে এখন অন্ধকার ছেয়ে আছে বেতন নিয়ে দুশ্চিন্তা। প্রায় ২ মাসের বেতন না পেয়ে ত্রাহি অবস্থা হাজার হাজার শ্রমিকের।

রোববার নিট গার্মেন্ট শিল্পের প্রধান কেন্দ্র ফতুল্লার বিসিক নিট পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় আড়াইশ ফ্যাক্টরির মধ্যে খোলা ছিল হাতে গোনা ২০ থেকে ২২টি কারখানা।

শ্রমিক উপস্থিতির সংখ্যাও ছিল অত্যন্ত কম। তবে যে স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছিল সেই সুরক্ষার চিহ্ন খুব কমই দেখা গেছে। ৫/৬টি ফ্যাক্টরিতে জীবাণুনাশক স্প্রের পাশাপাশি ছিল থার্মাল মেশিনে শরীরের তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা।

আর বাকিগুলোতে শুধুমাত্র শ্রমিকদের হাতে কয়েক ফোটা স্যানিটাইজার আর পায়ে সামান্য স্প্রে করেই প্রবেশ করানো হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের হ্যান্ড গলভস, মাস্ক বা কোন কোন ক্ষেত্রে পিপিই দেয়ার কথা থাকলেও কোন ফ্যাক্টরিতেই ন্যুনতম হ্যান্ড গলভসও সরবরাহ করা হয়নি।

তবে কাজ বন্ধ রাখা এমন প্রায় অর্ধশত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সামনেই ছিল বেতনের দাবিতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ভিড়। তারা জানান, সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর কিছু কিছু ফ্যাক্টরিতে বেতন দেয়া হলেও অধিকাংশ কারখানাতেই ২ মাসের বেতন দেয়া হয়নি।

শুধু ফতুল্লা বিসিকই নয় ফতুল্লার পুলিশ লাইন্স এলাকার ৮টি পোশাক কারখানার শ্রমিকরাও বকেয়া বেতনের দাবিতে রোববার বিক্ষোভ করেছে। এসময় একটি কারখানার শতাধিক শ্রমিক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক প্রায় ২ঘন্টা অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে।

বিসিকের ওয়েস্ট এ্যপারেলনের এমডি আসিফ হাসান মানু জানান, শ্রমিকরাই এই সেক্টরের প্রাণ। তাদের সুরক্ষা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। আমার কারখানায় সরকার নির্দেশিত সব সুরক্ষা ব্যবস্থা মেনেই স্বল্প পরিসরে শ্রমিকরা যোগ দিয়েছে।

তবে শ্রমিকরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, সুরক্ষা যতই দেয়া হোক, কয়েক হাজার শ্রমিকের মধ্যে কয়েকজন যদি করোনাভাইরাসের ক্যারিয়ার বা বাহক হয়ে থাকেন তবে ভয়ানক পরিস্থিতির শিকার হতে হবে শ্রমিকদেরই।

কয়েকজন শ্রমিক আক্ষেপের সাথে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সারা দেশ লকডাউন করতে পারলে নারায়ণগঞ্জের এইসব গার্মেন্টস কেন লকডাউন করতে পারবেন না?

নিট গার্মেন্ট মালিকদের বৃহৎ সংগঠন বিকেএমইএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলভ চৌধুরী জানিয়েছেন, চ্ট্টগ্রাম, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বিকেএমইএভুক্ত মোট ১০৮টি ফ্যাক্টরি খোলা ছিল।

শুধুমাত্র স্বল্প পরিসরে নিটিং, ডাইং ও সেপল সেকশন খুলেছে এবং আগামী মাসের শুরুর দিকে সুইং সেকশন পুরোদমে খুলবে। তবে সরকার নির্দেশিত সব স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কেউ ফ্যাক্টরি খুলতে পারবে না বলে সংগঠনের তরফ থেকে কঠোরভাবে বলা হয়েছে।

অপরদিকে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের জিএম আহসান কবীর জানিয়েছেন, সেখানকার ১৬টি ফ্যাক্টরি রোববার স্বল্প পরিসরেই খোলা ছিল।

মোট ৪০হাজার শ্রমিকের মাঝে রোববার ৭ হাজার ১৮৫জন শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, এসব কারখানার মালিক বিদেশি, তাই তারা সুরক্ষার বিষয়টি সবার আগে আমলে নিচ্ছেন।

বিকেএমইএর সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করেই ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা নিয়ে এবং ক্রেতা দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী সীমিত আকারে নারায়ণগঞ্জসহ বিকেএমইএর অন্তর্ভুক্ত কারখানাগুলো খোলা হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের প্রভাবের কারণে নিটওয়্যার পণ্যের ক্রেতা দেশগুলো প্রায় চার বিলিয়ন অর্ডার ক্যান্সেল করে দেয়। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের হাতে প্রায় ছয় বিলিয়ন অর্ডার বুকিং দেয়া আছে।

কিন্তু ক্রেতা দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী এই অর্ডার যদি সরবরাহ করা না যায় এবং যেসব দেশে গার্মেন্টস কারখানা খোলা রয়েছে (চীন ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া) ক্রেতা দেশগুলো যদি তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের শ্রমিকরা।

এই অবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করেই সরকারের নির্দেশনা মেনে এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সীমিত আকারে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের সব জায়গায় গার্মেন্টস কারখানার নিটিং, ডাইং ও স্যাম্পল সেকশন খোলা হচ্ছে।

তবে এখনই খোলা হচ্ছে না গার্মেন্টস কারখানার সুইং সেকশন। আর সুইং সেকশনে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করে। নিটিং, ডাইং ও স্যাম্পল সেকশনে স্বল্প সংখ্যক শ্রমিক কাজ করে। তাই এই সেকশনগুলো খোলা হচ্ছে।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য বিকেএমইএ ও বিজিএমইএ যৌথভাবে দেশের পাঁচটি এলাকায় যেখানে শ্রমিক অধ্যূষিত বলে চিহ্নিত নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া এবং চট্টগ্রামে শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পাঁচটি করোনা পরীক্ষার পিসিআর ল্যাব স্থাপণ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।

vod-26042020

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *