লন্ডনের কারাগারে মুসলিমদের রোজা পালনে দুঃসহ-যাতনার চিত্র।

৫ই মে, ২০২০

 

দ্যা ভয়েস অফ ঢাকাঃ  ১৮ বছর বয়সী সোলাইমানকে লন্ডনের মিডল্যান্ডে গ্লেনপার্ভা কারাগারে পাঠানো হয় ২০০৯ সালে।

আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সোলাইমান বলেন, ‘সময় জানার জন্য কারাকক্ষে কোনো ঘড়ি ছিল না। সেহরিতে মুসলিম কারাবন্দিদের ঠাণ্ডা দধি, ফল ও খেজুর দেয়া হতো। বিকাল ৫টায় নির্ধারিত সময়ে কারাবন্দিরা গরম খাবার পেত।

তিনি বলেন, যদিও কারা কর্তৃপক্ষ সবসময় বন্দিদের ফ্ল্যাস্কে ভরে খাবার দেয়ার কথা, যাতে দীর্ঘ সময় থাকার পরও খাবার গরম থাকে; কিন্তু সেহরিতে মুসলিম বন্দিদের তারা সবসময় প্লেটে করে ঠাণ্ড স্যাঁতসেঁতে তরকারি ও ভাত দিত। যদি কেউ বাইরে থেকে কোনো বন্দির জন্য টাকা পাঠাত, তখনই কেবল সে ভালো খাবার কিনে খেতে পারত।

সোলাইমান আরও বলেন, ইফতারের সময় টিভির অনুষ্ঠানসূচি দেখে অনুমান করে আমরা ইফতার শুরু করতাম।

আদম নামের আরেক ব্রিটিশ মুসলিমও ২০০৯ সালে কারাগারে ছিলেন।

তিনি বলেন, সত্যি বলতে– আমার জন্য প্রথম রোজাটি ছিল সত্যিই কষ্টকর। আমি যে কারাগারে ছিলাম, সেটির ৯০ শতাংশই সাদা আলোবিশিষ্ট। তাই ঘড়ি না থাকার কারণে ও আলোর কোনো পরিবর্তন না থাকার কারণে সময় বোঝা যেত না।

‘মুসলিম বন্দিরা তাদের নিজ নিজ কারাকক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। আর জুমার নামাজের জন্য কারাগারের ইবাদতের জায়গা খুলে দেয়া হতো।

তবে সৌভাগ্যবশত আমি ছিলাম লেইসিস্টারে যেটি বহু সংস্কৃতিবিশিষ্ট একটি শহর। ফলে সেখানকার কারা কর্তৃপক্ষ ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি ভালোই বুঝতেন।

আদম আরও বলেন, কিন্তু যেসব কারাগারে মুসলমান বন্দির সংখ্যা কম, সেখানে ধর্মপালনে বেশ বেগ পেতে হয়। মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হলেই সহজে জামাতে নামাজ আদায় করার সুযোগ পাওয়া যায়।

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন কারাগারে মুসলিম বন্দিদের ধর্মপালনে, বিশেষত রমজানে, প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি সম্প্রতি মাসলাহা নামক একটি মুসলিমবাদী সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারা কর্তৃপক্ষ মুসলিম পরিচয়কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে না; বরং কারাবন্দিদের মুসলিম পরিচয়টাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিভিন্ন নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

মাসলাহার পরিচালক রাহিল মুহাম্মদ আলজাজিরাকে বলেন, কারাগারে মুসলমানদের দাঁড়ি রাখা, নামাজ আদায় করা এবং আরবি পড়ার মতো সাধারণ বিষয়গুলোকেও মৌলবাদ মনে করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গোটা ইংল্যান্ডে মাত্র ৫ শতাংশ মুসলিম বাস করে। মুসলমানদের সংখ্যা নিতান্ত কম হলেও সেখানকার কারাগারগুলোতে মোট বন্দির ১৫ শতাংশই মুসলমান। এটি নিশ্চিতভাবে জাতিবৈষম্যের প্রমাণ বহন করে।

কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সোলাইমান অপরাধতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন। বর্তমানে তিনি অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে কর্মরত আছেন। যেখানে তিনি তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মুসলিম কারাবন্দীদের ধর্মপালন সহজীকরণে কাজ করে যাচ্ছেন।

সোলাইমান বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ যদি কোনো ধর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে ও ভয়ের চোখে দেখে, তা হলে বুঝতে হবে, এটি তাদের বোধশক্তি ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব।

মাসলাহার পরিচালক রাহিল দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, এই প্রতিবেদনটি তৈরি করার আগে আমি একজন সাবেক মুসলিম কারাবন্দির সঙ্গে কথা বলেছি। সে আমাকে বলেছে– কারাগারে থাকাকালীন সে একবার টুপি পরিধান করেছিল। এটি দেখে সেখানকার এক কারা কর্মকর্তা মন্তব্য করেন– তোমার মাথার ওপরে কনডমের মতো দেখতে ওটা কী? মন্তব্যটি ওই কারাবন্দিকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছিল।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে কারাগারে মুসলিম বন্দিদের ব্যাপারে মাসলাহার পরিচালক রাহিল মুহাম্মদ ও সাবেক কারাবন্দি সোলাইমান উভয়েই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

মাসলাহার দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই ১৭ বছরে কারাগারগুলোতে মুসলিম বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। যেখানে ২০০২ সালে মুসলিম বন্দি ছিল ৫৫০২ জন, সেখানে ২০১৯ সালে এদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩৩৪১ জনে।

রাহিল বলেন, এই বিশালসংখ্যক মুসলিম বন্দির জন্য কারা অভ্যন্তরে পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। এতে করে বন্দিদের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।

আলজাজিরা-vod-05052020

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *