রাস্তায় মানুষের ঢল ইউরুপে লকডাউন সিথিল

ইতালিতে লকডাউন শিথিলের পর রাস্তায় ঢল নামে সাধারণ মানুষের। সোমবার বিভিন্ন কাজে ৪৫ লাখ মানুষ ঘর থেকে বের হন। আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা করার পাশাপাশি মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে রাজধানী রোমের বিভিন্ন পার্ক। হাজার হাজার নির্মাণ শ্রমিকও তাদের কর্মস্থলে ফিরে এসেছে। এর মধ্যদিয়ে ইউরোপের দীর্ঘতম লকডাউন শেষে করোনাভাইরাস সঙ্কটের দ্বিতীয় স্তরে উপনীত হয়েছে।

 

লকডাউন শিথিলের পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে ইতালির রাস্তাঘাট। ভেনিসের সেইন্ট পার্ক স্কোয়ার ছিল লোকে লোকরণ্য। সেখানে এমনকি দূরত্ব বজায় রাখার মতো পরিবেশও দেখা যায়নি। অনেকে পিজা শপের সামনে দীর্ঘ লাইনে গিয়ে দাঁড়ান। তবে অনেক রেস্টুরেন্ট না খোলায় অলস সময় পার করছেন অনেক হোটেলকর্মী। লকডাউন  শিথিল করা হলেও বাইরে বের হলে মানতে হবে সামাজিক দূরত্ব ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি। এছাড়া, বাস ও মেট্রো রেলসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে ধারণ ক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশের বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না।

জার্মানিতে মৃত্যু হঠাৎ করে একশ’র নিচে (৫৪) নেমে এসে গত সোমবার শত ছাড়িয়ে (১২৭) যায়। এদিন লকডাউন  শিথিল করে কাজকর্মে ফিরে দেশটি। সামার পরীক্ষাকে সামনে রেখে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ফিরে আসে তাদের চিরচেনা ক্যাম্পাসে। প্রথম বিভাগ বুন্দেশলিগাও শুরু হচ্ছে ১৫ মে, তবে নির্দেশনা মেনে শুধুমাত্র দর্শকহীন মাঠে খেলা আয়োজন করা যেতে পারে। অপেশাদার আউটডোর গেমসেরও অনুমতি দেয়া হবে বলে জানা গেছে।

চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেলের সাথে টেলিফোনে কলোনার ভাইরাস বিধিনিষেধ কমানো নিয়ে আরও পদক্ষেপের বিষয়ে বুধবার মতবিনিময় করবেন জার্মানির রাজ্যপ্রধানরা, সোমবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন এই প্রস্তুতির সাথে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি।

সূত্রটি জানিয়েছে, সম্ভবত বৃহস্পতিবার ১১ মে থেকে বড় বড় দোকান পুনরায় খোলার জন্য রাজ্য প্রধানরা সবুজ সঙ্কেত দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, রাজ্যগুলি ধাপে ধাপে সমস্ত গ্রেডের জন্য স্কুলগুলি পুনরায় চালু করতে সম্মত হবে, যদিও বেশিরভাগ শিশুকে টানা নয়, শিফট ভিত্তিতে ক্লাসে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে বলে স‚ত্র জানিয়েছে।

দেশটির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল সতর্ক করেছেন যে, এ গ্রীষ্মের সাথে সাথে ১.৫ এর উপরে সামান্য বৃদ্ধিও জার্মানির হাসপাতালগুলিকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এক গবেষণা বলছে, জার্মানিতে অন্তত ১৮ লাখ মানুষের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই দ্রæত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি দেখছেন না গবেষকরা।

পর্তুগালে, চুলকাটা সেলুন এবং গাড়ি ব্যবসায়ীরা ছয় সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞার পরে রোববার তাদের কার্যক্রম শুরু করে। সরকারের পরিকল্পনার আওতায় গত সপ্তাহে প্রকাশিত স্টোর এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ফেস মাস্ক বা মুখোশ পরা বাধ্যতামূলক। দোকানগুলো সকাল দশটার আগে খুলতে পারবে না এবং অবশ্যই সামাজিক দূরত্বের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। হেয়ারড্রেসার এবং বিউটি সেলুন গ্রাহকরা কেবল অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারেন। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে মুখোশ না পরা কাউকে পাওয়া গেলে ৩৫০ ইউরো জরিমানা করা হবে। সরকার জানিয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবার চলাচলে নিষেধাজ্ঞাগুলি সহজ করা হবে। সিনিয়র স্কুলগুলো ১৮ মে পুনরায় চালু হবে, তবে বছরের শেষ অবধি প্রাথমিক ও মাধ্যমিত বিদ্যালয়ের জন্য দূরশিক্ষণ চালু থাকবে। ১৮ মে থেকে যাদুঘর, বার, রেস্তোরাঁ ও আর্ট গ্যালারীগুলো খুলবে।

স্পেনে হেয়ারড্রেসার এবং বিউটি সেলুনগুলির মতো অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসাগুলি সোমবার থেকে সীমিত পরিষেবাগুলি আবার শুরু করেছে। পরের পর্যায়ে, বার এবং রেস্তোরাঁগুলোর বহিরাঙ্গন ৫০ শতাংশ হারে খোলা যাবে যখন ১০ জন ব্যক্তির দলকে প্রকাশ্য স্থানে এবং বাড়ীতে সমবেত হবার অনুমতি দেয়া হবে।

ডেনমার্ক এবং ফ্রান্সের মতো কয়েকটি দেশে প্রথমে প্রাথমিক বিদ্যালয় আবার চালু করছে। তবে জার্মানি আপাতত সবচেয়ে কম বয়সী বাচ্চাদের ঘরে রেখেছে, যদিও কিছু বয়স্ক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফিরে এসেছে।

অস্ট্রিয়াতে, তাদের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা সোমবার উচ্চ বিদ্যালয়ে ফিরে এসেছেন, অন্য স্কুলগুলো ১৫ মে থেকে ‘ধাপে ধাপে’ পুনরায় খোলা হবে। বেশিরভাগ ক্লাস দুটি গ্রæপে বিভক্ত হবে পড়াশোনা করবে, যার মধ্যে একটি সোমবার থেকে বুধবার এবং অন্য গ্রæপ বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার। তারপরে পরের সপ্তাহে অদলবদল করবে বলে শিক্ষামন্ত্রী হেইঞ্জ ফ্যাসম্যান জানিয়েছেন।

গ্রিসও সোমবার বিধিনিষেধ সরিয়ে নিয়েছে। লোকদের তাদের বাসস্থান ছেড়ে বেরুনোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা যেখানে বাস করছে তার থেকে বেশি দূর যেতে পারবেন না। বইয়ের দোকান এবং সেলুনসহ কয়েকটি খুচরা দোকান এদিন এবং মাসের শেষের দিকে আবার খোলা হচ্ছে। স্কুলগুলি ১১ মে থেকে ধীরে ধীরে চালু হবে। গ্রীস পর্যটন উপর প্রচুর নির্ভর করে, কিন্তু করোনভাইরাস মহামারীর কারণে বড় আকারের বুকিং বাতিল হয়েছে। লকডাউন ব্যবস্থার অংশ হিসাবে এর সীমানা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন সহ স্পেন এবং ইতালি সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলির নাগরিকদের কাছে বন্ধ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে লকডাউল শিথিল

মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। অনেক দেশেই খুলে দেয়া হয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন, কল-কারখানা। ইরানের অনেক শহরেই লকডাউন  শিথিল করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানে খুলে দেয়া হয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শপিংমল। সোমবার থেকেই দেশটির ১৩২টি কাউন্টিতে অর্থাৎ প্রায় এক তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় মসজিদ খুলে দেয়া হচ্ছে। জর্ডানে রোববার থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর সবধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। বাহরাইন পবিত্র মাস রমজান শুরু হতেই কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। তবে বাইরে গেলে মাস্ক পরা বাধ্যতাম‚লক। সউদী আরবে ২৯ এপ্রিল থেকে ১৩ মে পর্যন্ত সবধরনের পাইকারি ও খুচরা পণ্য বিক্রয়কেন্দ্রগুলো খোলার ঘোষণা দেয়া হয়। বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলবে সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত। এছাড়া লেবানন, ইসরাইল, কাতার, ওমানেও লকডাউন শিথিল করা হয়েছে।

মৃত্যু আড়াই লাখ ছাড়াল

বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। ইতোমধ্যে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৩৭ লাখ। এ ছাড়া সুস্থও হয়েছেন সাড়ে ১২ লাখের বেশি মানুষ। গত ১১ জানুয়ারিতে করোনায় প্রথম মৃত্যু হয়েছিল। করোনায় মৃত্যুর তথ্য বলছে, ১১ জানুয়ারি প্রথম মৃত্যুর পর ২ এপ্রিল ৫০ হাজার ছাড়ায় করোনায় মুত্যু। এরপর ১০ এপ্রিল এটি এক লাখ, ১৭ এপ্রিল দেড় লাখ ও ২৬ এপ্রিল দুই লাখ ছাড়িয়ে যায়। আর এর আট দিন পর ৫ মে এসে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৩৮৬ জনে। গতকাল মঙ্গলবার ওয়ার্ল্ডমিটার্সের রেকর্ড থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১২ লাখ ১৫ হাজার ২৭৯ জন এবং মারা গেছেন ৭০ হাজার ১১৯ জন। এছাড়া, সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৯ জন।

নতুন করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপক হারে বাড়ছে রাশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে। রাশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৭০ জন, মারা গেছেন ১ হাজার ৪৫১ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১৯ হাজার ৮৬৫ জন। দেশটিতে গতকাল নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে ১০ হাজার ১০২ জন। ব্রাজিলে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৬২০ জন, মারা গেছেন ৭ হাজার ৩৬৭ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৪৫ হাজার ৮১৫ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডবিøউএইচও) জানায়, আগের দুই করোনাভাইরাস সার্স ও মার্সের তুলনায় কোভিড-১৯ সংক্রমণের দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০০৩ সালে সার্স (সিভিয়ার অ্যাকুইটি রেসপিরেটরি সিনড্রোম) করোনাভাইরাসে মারা যান ৭৭৪ জন। মোট আক্রান্ত হয়েছিলেন ৮ হাজার ৯৮ জন। অন্যদিকে, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আরেক করোনাভাইরাস মার্সে (মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৪৯৪, মারা গেছেন ৮৫৮ জন। সূত্র : এএফপি, এপি, রয়টার্স, ডেইলি মেইল ও বিবিসি।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *