ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী ইন্তেকাল- দ্যা ভয়েস অফ ঢাকার সম্পাদকের গভীর শোক প্রকাশ।

১২ই মে,২০২০ সম্পাদকীয়

ইসলামী রাজনীতিতে কি চেয়েছিলেন এবং কি ধরনের চিন্তা ভাবনা ছিল! ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামীর!!

ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ নেজামী

দ্যা ভয়েস অফ ঢাকা প্রতিবেদন ডেস্কঃ সম্পাদকীয়-  নেজামির শাণিত কলমের কলাম থেকে। এদেশের সকল ইসলামী রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার দাবী দীর্ঘ দিনের। বিভিন্ন সময় ইসলামী মনোভাবাপন্ন দল ও সংগঠনকে একত্রিত করা এবং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লাইন ও কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বৃটিশ আমল থেেেকই ইসলামী ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয় । বৃটিশ আমলে উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্যে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী(রহ.)-এর অনুসারিদের সমন্বয়ে মাওলানা শিব্বির আহমদ ওসমানীর নেতৃত্বে ১৯৪৫ সালে কোলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত উলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে গঠিত হয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে নেজামে ইসলাম পার্টির একাংশ, মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগের একাংশ ও আয়ূব বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত অন্যান্য দলের সমন্বয়ে ১৯৬৯ সনে নুরুল আমীনে সাহেবের নেতৃত্বে ইসলাম পছন্দ রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে খতীবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ(রহ)-এর নেতৃত্বে নেজামে ইসলাম পার্টি, জামায়াতে ইসলাম, পিডিপি ও অন্যান্য দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ(আইডিএল)। ইত্তেহাদুল উম্মাহ ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন গঠন করে ইসলামী ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস চালানো হয়।
তাছাড়া ঝালকাঠির মাওলানা আজিজুর রহমান(রহ.) কায়েদ সাহেবের উদ্ভাবিত তত্ত ¡”আল-ইত্তেহাদ মা’আল-ইখতেলাফ” আন্দোলন, হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ, মাওলানা মুহিউদ্দিন খাঁন(রহ.)-এর নেতৃত্বে সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদ এবং সমমনা ১২-দল প্রভৃতি ইসলামী দল ও ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে ইসলামী ঐক্য প্রক্রিয়ার অনুশীলন করা হয়েছে। এসব আন্তরিক প্রচেষ্টার কোনটাই প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পরিগ্রহ করেনি। কোন কোনটা অঙ্কুরেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ইত্তহাদুল উম্মাহ ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) গঠন সেই প্রক্রিয়ারই ফসল ।
ঝালকাঠির মরহুম মাওলানা আজিজুর রহমান যিনি কায়েদ সাহেব নামে বহুল পরিচিত ছিলেন। কায়েদ সাহেব ”আল-ইত্তেফাক মা’আল ইখতিলাফ” তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন। তিনি মনে করতেন সকল ইসলামী দল ঐক্যবদ্ধ না হয়েও এক সাথে কাজ করতে পারে। সেই লক্ষ্যে তিনি এই তত্ত্ব আবিস্কার করেন। নিজের উদ্ভাবিত তত্ত্বের ভিত্তিতে কায়েদ সাহেব ঝালকাঠি জেলা সদরে অবস্থিত নেছারাবাদ মাদ্রাসায় ইসলামী রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিত্বের একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। সেই সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্ট উলামা-মাশায়েখ হাজির হয়েছিলেন। সেই সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে যারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লখযোগ্য হচ্ছেনঃ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আমির চরমোনাইর মরহুম পীর মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মরহুম অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারুক, বর্তমানে কারারুদ্ধ জামায়াত নেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ও এডভোকেট নজরুল ইসলাম, মুফতি সাঈদ আহমদ ছাড়াও ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব হিসেবে আমিও সেই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। ঝালকাঠি থেকে শুরু এই উদ্যোগের কার্যক্রম পরে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। মিরপুরের দারুচ্ছালাম মাদ্রাসার মুফতি সাঈদ আহমদ সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত মাদ্রাসায় বেশ ক’টি বৈঠক ও অনুষ্ঠিত হয়। এই উদ্যোগ ও রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে একটি সংগঠনে রুপান্তরিত হয়। কেন্দ্রীয় শরীয়া কাউন্সিল নামে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান ও মহাসচিব হিসেবে মনোনীত হন মরহুম খতীব মাওলানা উবায়দুল হক, মাওলানা মুহিউদ্দিন খান ও মুফতি সাঈদ আহমদ প্রমূখ। খতীব সাহেবের ইনতেকালের পর কেন্দ্রীয় শরীয়া কাউন্সিলের কার্যক্রম ও স্থিমিত হয়ে যায়।
খুলনার দারুল উলুম মাদ্রাসার মুহতামিম মরহুম মাওলানা মাহমুদুর রহমান সাহেব ও একই উদ্দেশে সেই মাদ্রাসায় একটি উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন ডেকে সকল ইসলামী দলসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করার মহতি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মরহুম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আমির মরহুম মাওলানা ফজলুল করিম, পীর সাহেব চরমোনাই, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাবেক আমিরে শরীয়ত মরহুম শাহ আহমদ উল্লাহ আশরাফ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি মাওলানা আবদুর রকিব এ্যাডভোকেট ও মহাসচিব মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী প্রমূখ ইসলামী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
একটি মাত্র ইসলামী রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেস্টা সফল না হওয়ায় ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে একটি রাজনৈতিক জোট বা প্লাটফরম গঠনে প্রবৃত্ত হন প্রবীন আলেম বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির তৎকালীন সভাপতি মরহুম মাওলানা আশরাফ আলী ধরম-লী। তিনি মরহুম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজু হক, মরহুম মাওলানা আবদুল করিম শায়খে কৌড়িয়া, মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, মরহুম মাওলানা শামসুদ্দিন কাছেমী, মরহুম মাওলানা সৈয়দ মোঃ ফজলুল করিম( পীর সাহেব চরমোনাই), বাহাদুরপুরের পীর মরহুম মোহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া, মরহুম মাওলানা আহমদ উল্লাহ আশরাফ প্রমূখ ইসলামী নেতৃবৃন্দের সাথে পৃথক পৃথক ও দফায় দফায় বৈঠক করে সকল ইসলামী রাজনৈতিক দল সমূহকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা তাঁদেরকে অনুধাবন করাতে সক্ষম হন। তাঁদের আন্তরিকতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল হিসেবে তদানিন্তন প্রায় সকল সমমনা ইসলামী রাজনৈতিক দল—-বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পাটি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস(ঐক্যবদ্ধ), ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন (বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ ফারায়েজী জামায়াতÑএর সমন্বয়ে ১৯৯০ সনের ২২ ডিসেম্বর ইসলামী ঐক্যজোট গঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভের পর অধিকাংশ দল ইসলামী ঐক্যজোট থেকে আলাদা হয়ে যায়।
আগের যে কান সময়ের চাইতে এখন সবর্স্তরের ইসলামী জনতার মধ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ আজ ইঙ্গ-মার্কিণ-ইহুদী-ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রান্তে আমরা নানা সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত। দেশ-জাতি ও জনগণের স্বতন্ত্র জাতীয়তাবোধ, আদর্শ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, রীতি-নীতি, তাহযিব-তমদ্দুন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের চেতনাকে ধ্বংস করার জন্যে হেন অপপ্রয়াস নেই, যা করা হচ্ছে না। এহেন পরিস্থিতিতে সকল ইসলামী দল, সংগঠন, উলামায়ে কেরাম ও ইসলাম মনস্ক লোকদের সমন্বয়ে একটি সংগঠিত, সমন্বিত ও ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা-উপধারা এবং নানা তাত্ত্বিক ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে এসব ধারা উপধারার মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-কলহ নিরসন করে উলামা-মাশায়েখ ও দ্বীনদার বুদ্ধিজীবীদের একত্রিত করার প্রয়াস দৃঢ়তার সাথে অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা সকলেই অনুভব করছেন। তাই এ দায়িত্ব সম্পাদনের কাজকে ঐতিহাসিক কর্তব্য মনে করে সকল ইসলামী দল, সংগঠন ও উলামায়ে কেরামকে এগিয়ে আসতে হবে । তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধতার অনিবার্যতা দিন দিন ব্যাপক ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
পর্যায়ক্রমিক শাসনামলের দুর্নীতি, ব্যর্থতা, অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও দুঃশাসনে সৃষ্ট ধসে জনগণের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং তাদের কর্মকান্ডে জনগণের মোহমুক্তি ও অনীহ মনোভাব রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামী ধারার উত্থানকে অনিবার্য করে তুলেছে। ইসলাম মনস্ক লোকদের ঐক্যবদ্ধতার প্রয়োজনীয়তার আরো কারণ হচ্ছে, ইসলাম মুসলমান ও ইসলামের অনুশাসনের বিরুদ্ধে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের মোকাবেলা । যেমন ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে জঙ্গীবাদের আবিস্কার করা হয় অহরহ। অথচ ইসলামে জঙ্গবিাদ নেই। ইসলামপন্থীরাও জঙ্গী নয়। ইসলাম সার্বজনিন সাম্য, মৈত্রী, মানবিকতা ও কল্যাণের ধর্ম। ইসলামে জঙ্গীবাদ আবিস্কার ও মুসলমানদের জঙ্গী হিসেবে চিহিৃত করার সরলার্থ হচ্ছে উলামাদের অপ্রতিহত প্রভাব থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তাঁদের প্রতি জনগণকে শত্রুভাবাপন্ন করে তোলা। কারণ উলামাদের প প্রভাব জনগণের ওপর অপরিসীম। মুসলিম জীবন ব্যবস্থা নির্মাণের দায়িত্বে নিয়োজিত আলেম সমাজকে আঘাত করে সংঘাত সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। কতিপয় সংগঠন ও মাদরাসার নামের সাথে ইসলামী শব্দ সংযোজন করে ইসলামী রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও মাদরাসার ভাবমূর্তী ক্ষুন্ন করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে।
ইসলামী ঐক্য গঠনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জনগণের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক-স্বাতন্ত্র্য এবং ঐতিহ্যকে উর্ধ্বে তুলে ধরে এদেশের জনগণের চেতনায় ও ঐতিহ্যে ইসলামের অবদানকে সামনে আনা এবং আমাদের বিশ্বাস ও অঙ্গীকারকে জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রকাশ রূপ দিতে হবে । তাছাড়া সকল প্রকার ইসলাম বিরোধী অপতৎপরতা রোধ, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী ও উপনিবেশবাদীতার বিরোধীতা এবং নিপীড়িত মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন এবং সকল প্রকার অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামী চেতনাকে শানিত করে তোলার জন্যে ও ইসলামী ঐক্য প্রয়োজন।
ইসলামী অনৈক্যের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের দিক-নির্দেশনা সন্ধান করতে হবে সুষ্পষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে সকল ইসলামী দল, সংগঠন ও উলামায়ে কেরামের স্বাতন্ত্র্য নির্বিশেষে ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কারণ ঐক্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া আন্দোলনকে প্রাণবন্ত করার অন্য কোন বিকল্প নেই।

vod-120502020-c.tds.

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *