নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে কথায় কথায় অস্ত্র প্রদর্শন

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে কথায় কথায় অস্ত্র প্রদর্শন, গুলি করে মানুষ হত্যা, বুলেটের ভয় দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি যেন অহরহ ঘটনা। উপজেলার আট ইউনিয়নে ১৯টি সন্ত্রাসী বাহিনীর পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও অনেকের কাছে রয়েছে অবৈধ অস্ত্র। দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্রের পাশাপাশি অত্যাধুনিক সব অস্ত্রও রয়েছে তাদের হাতে। বিভিন্ন বাহিনীর একাধিক সূত্র ও স্থানীয়দের ধারণা, পুরো উপজেলায় কয়েকশ’ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা এবং এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও রাজনৈতিক নেতাদের সুনজরে থাকতেই ব্যবহার হয় এসব অস্ত্র। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সন্ত্রাসীদের অনেকেই অস্ত্রসহ ধরা পড়লেও তাদের ‘গডফাদাররা’ রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেগমগঞ্জের সন্ত্রাসীরা সাধারণত যেসব অস্ত্র ব্যবহার করে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ওয়ান শুটার গান, পাইপ গান, এলজি, একে-২২, আমেরিকান নাইন এমএম পিস্তল, সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ, নাইন এমএম, পয়েন্ট টু টু ও রিভলবার। এছাড়া বিপুলসংখ্যক ম্যাগাজিন, ককটেল, বারুদসহ বিভিন্ন বিস্ফোরকও রয়েছে তাদের কাছে। এসব অস্ত্রের মূল চালান আসে মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম এলাকা হয়ে এবং ভারত থেকে কুমিল্লা ও সিলেট হয়ে। পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ অস্ত্র আসে লক্ষ্মীপুর সীমান্ত হয়ে। অধিকাংশ সময় অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহার করা হয় ‘কিশোর গ্যাং’ সদস্য এবং শিশুদের। সাধারণত সিএনজিতে আনা-নেয়া করা হয় অস্ত্র। ছোট পিস্তল পরিবহনে মোটরসাইকেলের ব্যবহারই বেশি। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্রের আদলে বানানো বেশ কিছু খেলনা পিস্তলও রয়েছে। অস্ত্রের আধিক্য দেখাতে তারা খেলনা পিস্তল ব্যবহার করে থাকে।

জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বলছে, বেগমগঞ্জে গত দুই বছরে ওইসব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর হাতে অথবা তাদের যোগসাজশে খুন হয়েছেন ১৭ জন। এছাড়া অর্ধশতাধিক ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় রয়েছে তাদের সম্পৃক্ততা। সম্প্রতি এই জনপদের নামটি আলোচনায় এসেছে গত ২ সেপ্টেম্বর একলাশপুরে বিবস্ত্র করে নারী নির্যাতনের ঘটনায়। এ ঘটনার ভিডিও ৩২ দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

জানতে চাইলে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর এলাকা অপরাধমুক্ত করতে আমরা কাজ করছি। সন্ত্রাসীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোনো সন্ত্রাসীকে ছাড় দেয়া হবে না। অবৈধ অস্ত্র নিয়েও আমাদের কাজ চলছে। আশা করছি, শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে চলছে এই এলাকার সন্ত্রাসীদের শনাক্তের কার্যক্রম। আমাদের ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক’ শুরু হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে আমরা সাঁড়াশি অভিযানে যাব। কেবল নোয়াখালী নয়, লক্ষ্মীপুরের সন্ত্রাসপ্রবণ অঞ্চলগুলোতেও চলবে অভিযান। যেকোনো মূল্যেই হোক সন্ত্রাসের মূলোৎপাটন করা হবে।

সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর একাধিক সদস্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে সম্রাট বাহিনীর কাছে। এই সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি শতাধিক অস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় অস্ত্র রয়েছে ৫০টির মতো। আর পিস্তল রয়েছে ২০ থেকে ২৫টি। উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়ন ও পৌর হাজীপুরেই এদের বেশির ভাগ অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। এই বাহিনীর পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অস্ত্র রয়েছে সুমন বাহিনীর কাছে। সুমনের এক ঘনিষ্ঠজন যুগান্তরকে জানান, এই বাহিনীর কাছে অর্ধশতাধিক অস্ত্র রয়েছে। বিদেশি অস্ত্র আছে ১০টির মতো। গত ২৯ এপ্রিল বিয়ের অনুষ্ঠানে সুমন বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মো. মাহফুজুর রহমান ওরফে ফিরোজকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে সম্রাট বাহিনীর সদস্যরা। ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর চৌমুহনী পাবলিক হলে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় হামলা চালায় সম্রাট ও সুমন বাহিনী। এ সময়ও চলে অস্ত্রের ঝনঝনানি।

স্থানীয়রা জানান, উল্লিখিত দুই বাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে চলে কয়েকটি বাহিনী। এর মধ্যে দেলোয়ার বাহিনী, কাতা রাসেল বাহিনী, নিজাম বাহিনী উল্লেখযোগ্য। গত ২ সেপ্টেম্বর একলাশপুরে বিবস্ত্র করে নারী নির্যাতনের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ থেকে অস্ত্রসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন দেলোয়ার। এর আগে ২০১৮ সালের শেষ দিকে চৌমুহনী দক্ষিণ বাজারের নুরুল হক মিয়ার রাইস মিল এলাকায় দেলোয়ার একটি শটগান, দুটি গুলিসহ জনতার হাতে ধরা পড়েছিলেন বলে জানান এলাকাবাসী। তবে সম্রাটের অনুগত দুর্ধর্ষ কাতা রাসেল রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাতা রাসেল বাহিনী একবার দেলোয়ারের বাড়িতে হামলা করে ৩০-৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে যুগান্তরকে জানান দেলোয়ারের মা আকলিমা বেগম। সরেজমিন দেলোয়ারের বাড়িতে গিয়ে হামলার চিহ্ন দেখা গেছে।

বর্তমানে একেকটা গ্রুপের কাছে গড়ে ১০-১৫টি অস্ত্র আছে বলেও জানায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর একাধিক সদস্য। গোপালপুর ইউনিয়নে ২৫-৩০ জনের মাছুম বাহিনীর কাছে দেশীয় তৈরি এলজিসহ বিভিন্ন বিদেশি অস্ত্র রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। এলাকাবাসী জানান, পাশের উপজেলা সোনাইমুড়ীর জাকের বাহিনীর সঙ্গে এই বাহিনীর একাধিকবার গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। এই এলাকার কিশোর মাস্তান ‘শিশু রাসেল’ এর সঙ্গে বাহিনীগুলোর অস্ত্রসহ বিভিন্ন কাজে যোগাযোগ রয়েছে। লক্ষ্মীপুর সীমান্তবর্তী আমান উল্যাপুরের সবুজ বাহিনীর কাছে বিপুল পরিমাণে দেশীয় অস্ত্র আছে। তার বিপরীতে গড়ে ওঠা ধোপা মামুন বাহিনীর কাছেও দেশি-বিদেশি অস্ত্র আছে বলে জানান স্থানীয়রা। কেবল আমান উল্যাপুর, আলাইয়ারপুর ও ছয়ানি এই তিন ইউনিয়নে ২০০’র বেশি দেশি-বিদেশি অস্ত্র রয়েছে বলে যুগান্তরকে জানান এক সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য। রাজগঞ্জের মঞ্জু বাহিনীর মঞ্জুর কাছে সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ এমএম পিস্তলসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অস্ত্র রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। সে একাধিক মামলার আসামি বলে জানা গেছে।

বেগমগঞ্জের একটি চায়ের দোকানে কথা হয় উপজলোর শীর্ষ পাঁচ বাহিনীর একটির এক সদস্যের সঙ্গে। কথার একপর্যায়ে নিজ বাহিনীর ক্ষমতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মেশিন (অস্ত্র) আমাদের কাছে কি কম আছে? বেশি কাহিনী করলে (অন্য বাহিনী) ঝাঁঝরা করে দিব।’ কি পরিমাণ অস্ত্র তাদের কাছে রয়েছে- জানতে চাইলে কোমর থেকে একটি দেশীয় পিস্তল বের করে বলেন, ‘এমন ১১টা আছে। এরপর আরও লাগলে ম্যানেজ করা যাবে।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরন যুগান্তরকে বলেন, সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে এ পর্যন্ত ১০-১২ জন মানুষ খুন হয়েছেন। দুর্গম এলাকাগুলোতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বেশি সক্রিয়। কিছু লোকের ছত্রছায়ায় এসব বাহিনী রাতের বেলায় কাজ করে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে যেতে হবে। আমরা প্রশাসনকেও বলেছি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।

এদিকে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র থাকার খবর পাওয়া গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে বেগমগঞ্জে অস্ত্রের বড় চালান ধরতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর পেছনে তাদের শক্ত ভূমিকার অভাবের পাশাপাশি আরও একটি কারণ উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা। সেটি হল- সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো সাধারণত অপারেশনে গেলে অস্ত্র বের করে। অন্যান্য সময়ে তারা এমন সাধারণ ব্যক্তিদের কাছে অস্ত্র রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাদের কখনও সন্দেহও করবে না। কখনো ভয় দেখিয়ে আবার কখনও অর্থের লোভ দেখিয়ে তাদের কাছে অস্ত্রগুলো রাখা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করতে এসব অস্ত্রের ব্যবহার করে। কখনো আবার অস্ত্র ভাড়া দেয়া হয়। বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এক বাহিনীকে আরেক বাহিনী থেকে অস্ত্র ধার নেয়ার ঘটনাও রয়েছে। এলাকার বিভিন্ন নির্বাচন সামনে রেখে বাহিনীগুলোর কদর বাড়ে। ফলে এই সময়ে সন্ত্রাসীরা নতুন অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টায় থাকে। চৌমুহনী পৌরসভার আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে অস্ত্রের মহড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানায় একটি সূত্র। রাজনৈতিক নেতাদের কাছে নিজেদের শক্তি উপস্থাপন করে অবস্থান পাকাপোক্ত করতেই এমন তৎপরতা বলে জানায় সূত্রটি।

নোয়াখালী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) আলমগীর হোসেন যুগান্তরকে জানান, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *