বিয়ের ১২ দিনের মাথায় দাঙ্গায় স্বামীকে হারালেন তাসলিমা

ভারতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিয়ের মাত্র ১২ দিনের মাথায় নিহত হলেন ২২ বছর বয়সী আশফাক হোসেন। দুপুরে ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু আর ফেরা হলো না তার। তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এখন তার লাশ পেতে অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার। গায়ে জ্বর নিয়ে বাড়িতে পরে আছেন স্ত্রী তাসলিমা ফাতিমা। ঘুমের মধ্যে স্বামীকে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। স্বামীকে ভালোভাবে জানা কিংবা চেনা হলো না সদ্য বিবাহিত এই তরুণীর।

দিল্লির গোকুলপুরীর অন্তর্গত মুস্তফাবাদের ঘিঞ্জি গলির এক পাশে কোনও রকমে মাথা গোঁজার একটা জায়গা তাদের। পরিবার নিয়ে সেখানেই বসবাস পেশায় বিদ্যুৎকর্মী আশফাকের।

বিয়ে করেন গত ১৪ ফেব্রুয়ারির ভ্যালেন্টাইন ডেতে। উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহরের তসলিমার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ভেবেছিলেন সব কিছু মিটিয়েই দিল্লি ফিরবেন। তসলিমকে নিয়ে সেখানেই নতুন জীবনে পা রাখবেন। একে অপরকে চিনবেন, জানবেন। কিন্তু কাজের প্রয়োজনে রোববার রাতে স্ত্রীকে ছাড়াই মুস্তফাবাদে ফেরেন আশফাক। ঠিক তখনই জাফরাবাদ এবং মৌজপুরে বিক্ষোভের আগুনে লাগে। উত্তরপ্রদেশেও সে খবর পৌঁছায়। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে পর দিন ফিরে আসেন তসলিমও।

নয়াবউ হিসেবে ওই দিন তার কাঁধেই রান্নার ভার পড়ে। রান্না সেরে দুপুর নাগাদ সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। সেই প্রথম পাশাপাশি বসে খাওয়ার সুযোগ হয় স্বামী-স্ত্রীর। কিন্তু দুপুরে খাওয়ার পরই একটি ফোন আসে আশফাকের কাছে।

বলা হয়, পাড়ায় একটি বাড়িতে আচমকা বিদ্যুৎ চলে গিয়েছে। তাকে গিয়ে দেখতে হবে। ১২ দিনের স্ত্রীকে রেখে বাড়ি থেকে বের হন আশফাক। পরস্পরকে সেই শেষ দেখা তাদের। তারপর আর ফেরা হয়নি আশফাকের।

বাড়ি থেকে কিছু দূর এগোতেই গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরিবারের লোকজন কিছু জানার আগে স্থানীয়রাই তাকে নিউ মুস্তফাবাদের আল হিন্দ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই মৃত্যু হয় আশফাকের। ময়নাতদন্তের জন্য পরে গুরু তেগবাহাদুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তার মরদেহ। কিন্তু শুক্রবার পর্যন্ত তার দেহ হাতে পায়নি পরিবার।

এদিকে ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অন্তত ৪২জন নিহত হয়েছেন। এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দিল্লি পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

এক বিবৃতিতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়টি তারা বিবেচনা করেছেন।

এদিকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে বৃহস্পতিবার ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক সতর্ক বিবৃতিতে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিক অ্যালিস ওয়েলস দেখাতে চেয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার মতানৈক্য সামান্যই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের সময়েই এই দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। অ্যালিস বলেন, আমরা মোদির কথারই প্রতিধ্বনি করে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছি। সব পক্ষকেই শান্তি বজায় রাখা ও সহিংসতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে এই দাঙ্গা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, এটা ভারতের বিষয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মোদির অবিশ্বাস্য বিবৃতিরও প্রশংসা করেন তিনি।

ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিস্তৃত সহিংসতা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে সাড়া দিয়েছেন, তার সমালোচনা করেছেন দেশটির ডেমোক্র্যাটদলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স।

জবাবে ট্রাম্প বলেন, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। মানবাধিকার রক্ষায় তাদের নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মুসলিমবিদ্বেষী এই সহিংসতার শুরুতে পুলিশ নিষ্ক্রীয় ছিল। তলোয়ার, বন্দুক ও পাথর নিয়ে হিন্দুত্বাবাদীরা মুসলমানদের ওপর হামলা চালায়। তারা মুসলমানদের মসজিদ, ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও সম্পত্তি আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মার্কিন কমিশমনও পুলিশের নিষ্ক্রীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

দিল্লিতে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘর্ষে বেছে বেছে মুসলিমদের উপর হামলা চালানো হচ্ছে। সব দেখেও সরকার নীরব বলে অভিযোগ করেছে এই কমিশন।

মার্কিন কমিশন বলেছে, মুসলিমদের ওপর আঘাতের আবহে ভারত সরকারের উচিত ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *